শেখ দিদারুল আলম, বাংলা হেডলাইনস খুলনা ব্যুরো : খুলনার প্রফুল্ল রায়। শূন্য থেকে জীবন শুরু করে আজ যিনি সমাজের অন্যতম ধনাঢ্য ব্যক্তি।
একসময় যিনি অর্ধাহারে-অনাহারে দিন কাটিয়েছেন, আজ তিনি একজন শুধুমাত্র বিশিষ্ট ব্যবসায়ী ও সমাজসেবী নন। রাষ্ট্রীয় পুরস্কার প্রাপ্ত একজন ব্যবসায়ী।
সমাজ সেবক হিসেবে তিনি একাধারে যেমন দান করেন তেমনি স্কুল, কলেজ প্রতিষ্ঠার সাথে মসজিদ-মন্দিরে নীরবে সহযোগিতা করেন। একদিন যিনি দিনের পর দিন না খেয়ে জীবন অতিবাহিত করেছেন। আজ তারই ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে কাজ করে কয়েক শত পরিবার বেঁচে আছে।
প্রফুল্ল রায় ১৯৫৪ সালের একুশে সেপ্টেম্বর খুলনা জেলার, তেরোখাদা উপজেলার, প্রসাদনগর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতার নাম অনিল কৃষ্ণ রায় আর মাতার নাম পাতা রানী রায়। বর্তমান সময়ের মতো তখনকার গ্রাম এত উন্নত ছিল না। ছোটবেলা তার বাবা তাকে প্রাইমারিতে ভর্তি করে দেন। কাদা-পানি ভেঙে খাল পার হয়ে ৬-৭ মাইল দূরে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে যেতেন।
তালপাতায় কয়লার গুড়া দিয়ে কালি বানিয়ে প্রথমেই লেখার অভ্যাস শুরু। এভাবে তার কেটে যায় প্রাথমিক পাঁচ বছর। ষষ্ঠ শ্রেণীতে তিনি ভর্তি হন শ্রীপুর মধুসূদন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে। ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরু হলে পাক হানাদার বাহিনীর হাত থেকে বাঁচার জন্য বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে নৌকাযোগে ভারতে চলে যান। এ সময় তিনি বাংলাদেশ থেকে আশ্রয় নেওয়া অসহায় মানুষদের পাশে দাঁড়ান।
অবশ্য এর আগে ষষ্ঠ শ্রেণীতে পড়া অবস্থায় থেকে তিনি তার এলাকার হাটের দিনে গ্রামের বাজারে বসে বাবার ব্যবসায় সহযোগিতা করতেন। তার কাজ ছিল কলাপাতা ও কচুপাতায় লবণের টোপলা বাধা আর তা বিক্রি করা। অভাবের সংসারে এভাবেই তাদের দিন চলত। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর তিনি সপরিবারে দেশে ফিরে আসে কিন্তু তার তেমন কোন কাজ ছিল না।
ফলে তিনি বাধ্য হয়ে কাঠের ফার্নিচারের দোকানে কাজ নেন এবং যত সামান্য সে টাকা পেতেন তাই দিয়েই তার সংসার চলত।
ভাগ্য অন্বেষণে ১৯৭৩ সালের প্রথম দিকে ভারতে চলে যান। এসময় তিনি ভারতের ট্রেনে হকার ব্যবসা শুরু করেন। তিনি এ সময় ট্রেনে লেবু, শসা, পেয়ারা ইত্যাদি বিক্রয় করতেন। আর অবসর সময়ে কাঠের ফার্নিচারের দোকানে কাজ করতেন। এভাবেই চলত তার জীবন। সে সময় তিনি পশ্চিম-বাংলার বনগাঁ -চাঁদপাড়ায় ১০ টাকা ভাড়া দিয়ে একটি ঘর নিয়ে থাকতেন।
পরবর্তীতে ১৯৭৬ এর শেষের দিকে দেশে ফিরে আসেন। নেমে পড়েন জীবন-সংগ্রামে কিন্তু কোন কূলকিনারা খুঁজে পাচ্ছিলেন না তিনি। চারদিকে অন্ধকার দেখা শুরু করেন। যেহেতু কাঠের কাজ (ফার্নিচার) তার জানা ছিল তাই টুকটাক কাজ করে খেয়ে না খেয়ে জীবন পরিচালনা করতে থাকেন । এরই এক পর্যায়ে তিনি ঠিকাদারি ব্যবসার সাথে যুক্ত হন। তাঁকে এই কাজে সহযোগিতা করতেন রূপসার সাবেক চেয়ারম্যান ইলিয়াস আলী ও মাওলানা মুজিবুর রহমান।
কিন্তু প্রথম ঠিকাদারি কাজের লাভ তো হয়নি উপরোক্ত লক্ষাধিক টাকা দেনাগ্রস্ত হয়ে পড়েন। এই সময় তিনি যশোর হয়ে মাত্র ২০ টাকা হাতে নিয়ে ঢাকার মুন্সিগঞ্জ চলে যান। কখনো রাস্তায় আবার কখনো ট্রেন স্টেশনে তিনি রাত্রিযাপন করেন। এ সময় প্রায়ই তিনি না খেয়ে থাকতেন। অবশেষে মুন্সীগঞ্জের (শ্রীনগর) একটি সয়ামিলে চাকরি নেন এবং যা আয় করতেন তা জমিয়ে রাখতেন।
পরবর্তীতে তার কাজে সন্তুষ্ট হয়ে ঢাকার একটি বড় কোম্পানি তাকে চাকরি দেয়। এসময় তিনি খুলনা থেকে কাঠ নিয়ে চুক্তিতে কাজ করা শুরু করলেন এবং তার ভাগ্যের চাকা খুলতে লাগলো। এক পর্যায়ে তিনি খুলনায় লক্ষাধিক টাকা দেনা পরিশোধ করেন।
খুলনার বাগমারায় পরিবার-পরিজন নিয়ে থাকতেন এবং ঠিকাদারি কাজ শুরু করেন এরপর থেকে তিনি যেখানে হাত দিয়েছেন সেখানেই সোনা ফলেছে।
১৯৯২ সালে পাথরের ব্যবসা ও ১৯৯৫ সালে ইট ভাটার ব্যবসা শুরু করেন এবং ব্যবসায় প্রসার লাভ করেন। পরবর্তীতে তিনি মাছের খাদ্য উৎপাদন, সেমি ইনটেনসিভ পদ্ধতিতে চিংড়ি চাষ শুরু করেন। পরবর্তীতে গত বছরে তিনি সরকারের অনুমতি নিয়ে ভেনামি চিংড়ি চাষ শুরু করেন এবং সফলতা পান। সরকার তার কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ ২০০৮ সালে মাছের খাদ্য উৎপাদনে রাষ্ট্রীয় পুরস্কার , ২০১৬ সালে সেমি ইনটেনসিভ পদ্ধতিতে চিংড়ি মাছের চাষের জন্য পুরস্কার এবং ২০১৬ সালে রাষ্ট্রীয় পুরস্কার লাভ করেন।
সমাজ সেবক হিসেবে গত করোনাকালীন সময় অকাতরে খাদ্য দিয়ে সহযোগিতা করেছেন অনেককে। তিনি হিন্দু হয়েও বিভিন্ন মসজিদ নির্মাণে সহযোগিতার করে থাকেন। একটি বিরাট অংশের ইট বিনামূল্যে দিয়ে থাকেন।
তিনি যেমন সীমা স্মৃতি বিদ্যাপীঠ নামে খুলনার কৈয়াএলাকায় একটি উচ্চ বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেছেন তেমনি দুটি প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেছেন। খুলনার অনেক স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীরা তার অর্থে লেখাপড়া করছে।
তিনি বলেন ‘উপরওয়ালা আমাকে টাকা দিয়েছে আমার জন্য নয়। বরং জনগণের সেবার জন্য। তাই আমি সহযোগিতা করি।’
প্রচার বিমুখ এই মানুষটি অত্যন্ত সাদাসিধে জীবন পালন করেন। যার মধ্যে নেই কোন অহংকার। এটাই তার গর্ব।