বাংলা হেডলাইনস রাঙ্গামাটি প্রতিনিধিঃ বেইন ঘর আর চরকায় সুতা কাটার মাধ্যমে রাঙ্গামাটি রাজবন বিহারে বৌদ্ধ ধর্মাবলন্বীদের বড় ধর্মীয় অনুষ্ঠান দানোত্তম কঠিন চীবর দান শুরু হয়েছে। বৃহস্পতিবার বিকালে সূত্রপাঠ করে বেইন ঘর উদ্বোধন করেন মহাপরিনির্বাণগত মহাসাধক শ্রীমৎ সাধনানন্দ মহাস্থবির বনভান্তের শিষ্যমন্ডলীগণ ও চাকমা রাজা ব্যারিষ্টার দেবাশীষ রায় চরকায় সূতা কেটে দুই দিনের কঠিন চীবর দান উৎসবের সূচনা করেন। শুক্রবার বিকালে ভিক্ষু সংঘের কাছে চীবর দানের মাধ্যমে শেষ হবে দানোত্তম কঠিন চীবর দান।
রাজবন বিহারের বিশাল এলাকা জুড়ে অর্ধশতাধিক চরকা ও ২শতাধিক বেইন স্থাপন করা হয়েছে। প্রায় ৫ শতাধিক মহিলা এই চীবর তৈরীর কাজে অংশগ্রহণ করছে। উৎসবকে নির্বিঘ্নে করতে আইন-শৃংখলা বাহিনী পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহন করেছে। প্রায় ৬ শতাধিক পুলিশ সদস্য বিহারের ভিতরে এবং বাইরে নিরাপত্তা ব্যবস্থায় নিয়োজিত রয়েছে।২৪ ঘন্টার পরিশ্রমে তৈরী করা এ চীবর চাকমা রাজা দেবাশীষ রায় প্রয়াত পার্বত্য ধর্মীয় গুরু বনভন্তে স্মৃতির উদ্দেশ্যে শুক্রবার ভিক্ষু সংঘের কাছে এ চীবর উৎসর্গ করবেন। রাতে রাজবন বিহারে ফানুষ উড়িয়ে শেষ হবে রাজবন বিহারে বৌদ্ধ ধর্মাবলন্বীদের বড় ধর্মীয় অনুষ্ঠান দানোত্তম কঠিন চীবর দান উৎসব।

বৌদ্ধ ভিক্ষুদের পরিধেয় গেরুয়া কাপড়কে বলা হয় চীবর। ২৪ ঘন্টার মধ্যে তুলা থেকে চরকায় সূতা কেটে, সুতা রং করে আগুনে শুকিয়ে সেই সুতায় তাঁতে কাপড় বুনে চীবর তৈরী করে বৌদ্ধ ভিক্ষুদের দান করা হয় বলে এর নাম কঠিন চীবর দান বলা হয়। পার্বত্য এলাকার বৌদ্ধরা দানোত্তম কঠিন চীবর দান উৎসব পালন করেন প্রাচীন নিয়মে। প্রাচীন নিয়ম মতে ২৪ ঘন্টার মধ্যে চীবর তৈরী করে বৌদ্ধ ভিক্ষুদের উৎসর্গ করা হয়। বিশ্বের আর কোথাও এ নিয়মের প্রচলন নেই। তাই ধর্মপ্রাণ বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীরা কঠিন চীবর দানে অংশগ্রহন করতে দূর-দূরান্ত থেকে হাজার হাজার পূণার্থী এই উৎসবে সমবেত হন।
বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় এই অনুষ্ঠান ঘিরে উৎসব মুখর হয়ে উঠেছে রাজবন বিহারের পুরো এলাকাসহ গোটা রাঙ্গামাটি শহর। উৎসবে যোগ দিতে রাজবন বিহারের বুধবার থেকে অগণিত পূণ্যার্থীর ঢল নেমেছে। পূর্ণ্যময় অনুষ্ঠানে যোগ দিতে সড়ক ও নৌপথে তিন পার্বত্য জেলার বিভিন্ন পাহাড়ি গ্রাম ও জনপদ থেকে হাজার হাজার নারী-পুরুষ সমবেত হচ্ছে। এছাড়া দেশ-বিদেশ থেকে অসংখ্য পূণ্যার্থী ও দর্শনার্থীদের আগমন ঘটছে। উৎসব ঘিরে রাজবন বিহার পুরো এলাকায় বসছে মেলা। ধর্মীয় কীর্তন, নাটক, চরকায় সুতা কাটা, বেইন বোনা, কল্পতরু শোভাযাত্রাসহ চলছে বর্ণাঢ্য নানা আয়োজন। বৌদ্ধ শাস্ত্র মতে, দীর্ঘ আড়াই হাজার বছর পূর্বে গৌতম বুদ্ধের শিষ্য বিশাখা ২৪ ঘন্টার মধ্যে চীবর তৈরীর প্রচলন করেছিলেন। প্রতি বছর আষাড়ী পূর্ণিমা থেকে কার্তিকী পূর্ণিমা পর্যন্ত তিনমাস বৌদ্ধ ভিক্ষুদের বর্ষাবাস শেষে বৌদ্ধ ভিক্ষুদের চীবর দান করতে হয়। এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৭৩ সাল থেকে বুদ্ধের শিষ্য বিশাখা প্রবর্তিত নিয়মে রাঙ্গামাটি রাজবন বিহারে ৪৬ বছর ধরে কঠিন চীবর দান উৎসব উদযাপিত হয়ে আসছে। বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের মতে, জগতে যত প্রকার দান রয়েছে তার মধ্যে এ চীবর দানই হচ্ছে সর্বোত্তম দান।