বাংলা হেডলাইনস বগুড়া: বগুড়ার দুপচাঁচিয়ায় রং মিস্ত্রি সেলিম প্রামানিককে (৩২) ডেকে নিয়ে পিছনে হাত বেঁধে, পুরো মুখ টেপ দিয়ে মুড়িয়ে ও গলাকেটে হত্যার পর লাশ আগুনে পুড়িয়ে দেয়ার রহস্য উন্মোচিত হয়েছে।
গ্রেফতারকৃত প্রেমিকা ও তার বাবা শনিবার বিকালে সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আবদুল মোমিনের আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে। গোপন মিলনের ছবি স্বামীকে দেয়ায় পরকীয়া প্রেমিকা তার বাবার পরিকল্পনায় স্মরণকালের নৃশংস এ হত্যাকান্ড সংঘটিত হয়। গোয়েন্দা বিভাগের (ডিবি) ইন্সপেক্টর আসলাম আলী এর সত্যতা নিশ্চিত করেছেন।
নিহত রং মিস্ত্রি সেলিম প্রামানিক দুপচাঁচিয়া উপজেলার খিদিরপাড়া গ্রামের কফির উদ্দিনের ছেলে। গ্রেফতার দু’জন হলেন একই গ্রামের আবদুর রহমান (৫০) ও তার মেয়ে রূপালী বেগম (২৫)।
শনিবার দুপুরে বগুড়ার পুলিশ সুপার আলী আশরাফ ভুঞা তার কার্যালয়ের সম্মেলন কক্ষে প্রেসব্রিফিং-এ জানান, গত ৫ ফেব্রুয়ারি দুপুরে বগুড়া ও জয়পুরহাটের সীমান্ত এলাকায় দুপচাঁচিয়া উপজেলার চামরুল ইউনিয়নের বড়কোল গ্রামের মাঠ থেকে রঙ মিস্ত্রি সেলিমের গলাকাটা ও আগুনে পোড়ানো লাশ উদ্ধার করা হয়। বাবা কফির উদ্দিন দাঁত ও পরনের পাঞ্জাবীর অংশ দেখে ছেলের লাশ সনাক্ত করেন। এ ব্যাপারে তিনি দুপচাঁচিয়া থানায় অজ্ঞাতদের বিরুদ্ধে মামলা করেন। লাশের পাশে একটি চাকু ও ৬ পিস কনডম পাওয়া যায়।
হত্যা রহস্য উন্মোচনে ডিবি ও দুপচাঁচিয়া থানা পুলিশ মাঠে নামে। হত্যায় জড়িত সন্দেহে পরকীয়া প্রেমিকা রূপালী বেগম ও তার বাবা আবদুর রহমানকে গ্রেফতার করা হয়।
জিজ্ঞাসাবাদে তারা লোমহর্ষক হত্যার স্বীকারোক্তি দেন। রূপালীর স্বামী ইকরামুল হক দেড় বছর ধরে সৌদি আরবে চাকরি করেন। নিহত সেলিম ও রূপালীর মধ্যে ছোটবেলায় প্রেমের সম্পর্ক ছিল। দু’জনের অন্যত্র বিয়ে হলেও তাদের মধ্যে মোবাইল ফোনে প্রেম অব্যাহত ছিল। স্বামী বিদেশ যাওয়ায় রূপালী ও সেলিমের প্রেমের সম্পর্ক আরো গভীর হয়। বিভিন্ন সময়ে তারা একান্তে মিলিত হয়। সেলিম এক পর্যায়ে রূপালীকে বিয়ের প্রস্তাব দেন। রূপালী বিয়ের প্রস্তাব নাকচ করে। এতে সেলিম ক্ষুব্ধ হয়ে ইমোর মাধ্যমে তাদের একান্তে মিলনের দৃশ্য সৌদি আরবে রূপালীর স্বামীর কাছে পাঠান। ইকরামুল ছবিগুলো দেখার পর রূপালীকে জানান।
রূপালী সন্দেহ করেন যে, সেলিম তাদের গোপন মিলনের ছবি তার স্বামীকে পাঠিয়েছে। রূপালী তাকে শায়েস্তা করার পরিকল্পনা করে। রূপালী বার বার বিয়ের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করলে সেলিম তাদের ভিডিও চিত্রগুলো ইন্টারনেটে ছেড়ে দেবার হুমকি দেন। এতে ক্ষুব্ধ রূপালী বিষয়টি তার বাবা আবদুর রহমানের সাথে আলাপ করেন। তারা সেলিমের মুখ বন্ধ করার পরিকল্পনা করে।
সেলিমকে খুন করতে রূপালী পূর্ব পরিচিত এক খুনির সাথে পরামর্শ করে। আলোচনা অনুসারে রূপালী বিয়েতে রাজি হওয়ার অভিনয় করবে এবং হত্যার কাজে ব্যবহৃত উপকরণ কিনতে দুই হাজার টাকা দেয়।
পূর্ব পরিকল্পনা অনুসারে রূপালী গত ৪ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে ফোনে সেলিমকে জানায়, তারা পালিয়ে বান্ধবীর বাড়িতে গিয়ে বিয়ে করবে। তারা গোপনে নিজ নিজ বাড়ি থেকে বের হবার পর মিলিত হয়। এরপর রিকশা ভ্যানে ৪/৫ কিলোমিটার গিয়ে পাকা রাস্তা থেকে নেমে হেঁটে মাটির রাস্তা দিয়ে পার্শ্ববর্তী জয়পুরহাট জেলার ক্ষেতলাল উপজেলার বেরুজ গ্রামের দিকে যেতে থাকে। পথিমধ্যে রূপালীর বাবা আবদুর রহমান ও তার তিন সহযোগী সেখানে আসে। তারা কথা আছে বলে রূপালী ও সেলিমকে রাস্তা থেকে মাঠের মধ্যে নিয়ে যায়। রূপালী তার প্রেমিক সেলিমকে বাবা ও অন্যদের হাতে তুলে দিয়ে বাড়িতে ফিরে যান। তারা সেলিমকে বড়কোল ও বেরুজ গ্রামের ফসলের মাঠে নিয়ে যায়। প্রথমে তারা রশি দিয়ে সেলিমের হাত পেছনে ও দুই পা বেঁধে ফেলে। স্কচটেপ দিয়ে পুরো মুখমন্ডল পেঁচিয়ে ফেলা হয়। এরপর গলাকেটে সেলিমকে হত্যা করা হয়।
লাশের পরিচয় গোপন ও ঘটনা ভিন্নখাতে প্রবাহিত করতে মোবাইল ফোন ও পরিধেয় কাপড় বুকের উপর রেখে কোন দাহ্য পদার্থ ঢেলে আগুন জ্বালিয়ে দেয়া হয়। এছাড়া লাশের পাশে ৬টি কনডম রেখে সকলে পালিয়ে যায়।
পুলিশ সুপার আরো জানান, জিজ্ঞাসাবাদে জানা যায়, হত্যাকারীরা টেলিভিশনে বিভিন্ন সিরিজ দেখে হত্যার কৌশল রপ্ত করে। তদন্ত করে নিশ্চিত হবার পর শুক্রবার রাতে বাড়ি থেকে আবদুর রহমান ও তার মেয়ে রূপালীকে গ্রেফতার করা হয়। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে এরা হত্যার দায় স্বীকার, হত্যার কারণ ও অন্য খুনিদের নাম প্রকাশ করে। তারা হত্যার লোমহর্ষক বর্ণনা দেয়।
ডিবির ইন্সপেক্টর আসলাম আলী জানান, শনিবার বিকালে দু’জনকে বগুড়ার সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আবদুল মোমিনের আদালতে হাজির করা হয়। প্রথমে আবদুর রহমান ও পরে তার মেয়ে রূপালী ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে। পরে আদালতের নির্দেশে তাদের বগুড়া জেল হাজতে পাঠানো হয়েছে।
তিনি আরো জানান, অন্য তিন আসামিকে গ্রেফতারে অভিযান চলছে। এদিকে স্বল্প সময়ে লোমহর্ষক ও নৃশংস হত্যাকান্ডের রহস্য উদঘাটন ও দুই আসামি আদালতে স্বীকারোক্তি দেয়ায় জনগণের মাঝে স্বস্তি দেখা দিয়েছে।