বাংলা হেডলাইনস বগুড়া প্রতিনিধি: সাইবার অপরাধ দমনে গঠিত সাইবার পুলিশ বগুড়ার (সিপিবি) কতিপয় অসাধু কর্মকর্তা নিরীহ জনগণকে ফাঁদে ফেলে টাকা আদায় ও তাদের নানাভাবে হয়রানিতে জড়িয়ে পড়েছেন।
শুধু তাই নয়; তারা তাদের অনুগত ব্যক্তিকে অবৈধভাবে ‘পুলিশের আদলে পরিচয়পত্র’ প্রদান করে তাদের মাধ্যমে এসব অপরাধ করাচ্ছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
সম্প্রতি একটি ঘটনা ফাঁস হয়ে যাওয়ায় অতি গোপনে সাইবার ইনচার্জসহ দু’কর্মকর্তার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। তাদের এহেন কর্মকান্ডে সৎ পুলিশ সদস্যরা বিব্রতবোধ করছেন।
ভুক্তভোগীরা মানুষের বিশ্বাস অর্জনে সিপিবি ঢেলে সাজাতে পুলিশের আইজিসহ সংশ্লিষ্ট সকলের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।
এ প্রসঙ্গে সিপিবি প্রতিষ্ঠায় অগ্রণী ভুমিকা পালনকারী বিদায়ী পুলিশ সুপার আলী আশরাফ ভুঞা বলেন, তিনি কাউকে পুলিশের আইডি কার্ড দেননি। কেউ কার্ড তৈরি করে সাইবার ট্রেইনারদের বিপদে ফেলার চেষ্টা করছেন।
অনুসন্ধানে জানা যায়, বগুড়া ও আশপাশের জেলায় সাইবার অপরাধ দমনে গত ২০১৯ সালের ২৪ জানুয়ারি সাইবার পুলিশ বগুড়ার (সিপিবি) যাত্রা শুরু হয়। রাজশাহী রেঞ্জের সাবেক ডিআইজি এম খুরশীদ হোসেন বগুড়া পুলিশ সুপার কার্যালয়ে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে ফিতা কেটে এর কার্যক্রম উদ্বোধন করেন।
প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্য ছিল সাইবার অপরাধ দমন ও প্রতিটি মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। আপত্তিকর ব্যক্তিগত ছবি বা ভিডিও, মিথ্যা তথ্য, বিভিন্ন ধরণের গুজব ইত্যাদি ফেসবুকসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়ানোসহ মোট ২১ ধরণের অপরাধকে সাইবার অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।
পুলিশ সুপারের নেতৃত্বে একজন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার, চারজন ইন্সপেক্টরসহ মোট ১২ সদস্যের টিম নিয়ে সিপিবির কার্যক্রম শুরু হয়।
শুরুতে সিপিবির কার্যক্রম নিয়ে জনগণ সন্তুষ্ট ছিলো । সিপিবি ১২ সদস্যের টিম হলেও মূলত: পরিচালনা করতেন, সাইবার ইনচার্জ ইন্সপেক্টর এমরান মাহমুদ তুহিন ও এসআই শওকত আলম।
পরবর্তীতে কিছু দায়িত্বশীল কর্মকর্তা এটিকে অর্থ হাতিয়ে নেওয়া ও জনগণকে হয়রানির প্রতিষ্ঠানে পরিণত করেন। জাকারিয়া শিকদার ও তন্ময়সহ কয়েকজনকে সাইবার পুলিশের আইডি কার্ড দেওয়া হয়।

কার্ডে তাদের পদবি দেওয়া হয় ‘সাইবার ক্রাইম অ্যানালিষ্ট’। কার্ডে অথরিটি হিসেবে পুলিশ সুপার আলী আশরাফ ভুঞার স্বাক্ষর রয়েছে। পুলিশ না হয়েও এরা পুলিশের আদলে পরিচয়পত্র বহন করেন। তাদের দিয়ে ইন্টারনেটে আউটসোর্সিং ও অন্যান্যভাবে উপার্জনকারী তরুণ-যুবককে অপরাধী সাজিয়ে তাদের পরিবারের কাছে মোটা অংকের অর্থ হাতিয়ে নেওয়া শুরু হয়।
গত বছরের ২৪ নভেম্বর বগুড়ায় অনুষ্ঠিত সাইবার সিকিউরিটি অ্যান্ড ইনভেস্টিগেশন কোর্সে তাদের সরব উপস্থিতি লক্ষ্য করা গেছে।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন, ডিআইজি আবদুল বাতেন।
সিপিবির সেকেন্ডম্যান খ্যাত এসআই শওকত আলম গত ২০১৯ সালে বগুড়া ডিবি পুলিশের এএসআই ছিলেন।
বগুড়ায় ৪ জুলাই অনুষ্ঠিত পুলিশ কনস্টেবল নিয়োগ পরীক্ষার আগের দিন ঘুষ লেনদেনের অভিযোগ উঠে। পুলিশের সদর দফতরের গোয়েন্দা ইউনিট ফোনে আড়িপেতে এএসআই শওকত ও রিজার্ভ অফিসের এএসআই ফারুক হোসেনকে শনাক্ত করে। ঘুষ লেনদেনে জড়িত থাকায় সদর দফতরে নির্দেশে তাদের চট্টগ্রাম রেঞ্জের কুমিল্লায় ষ্ট্যান্ড রিলিজ করা হয়।
তবে হাইতিতে জাতিসংঘ শান্তি মিশনে উর্ধতন এক কর্মকর্তার সাথে সুসম্পর্কের কারণে তাকে কুমিল্লা থেকে বগুড়ায় এনে এসআই পদে পদোন্নতি দেয়া হয়। শুধু তাই নয়; এত বড় অপরাধ করার পরও তাকে সাইবার পুলিশের দ্বিতীয় ম্যান হিসেবে ক্ষমতা প্রদান করা হয়।
সিপিবির ইনচার্জ এমরান মাহমুদ তুহিন ও এসআই শওকত মাহমুদের নেতৃত্বে ‘পুলিশের আইডি কার্ড’ বহনকারী জাকারিয়া শিকদার, তন্ময় প্রমুখ আউটসোর্সিং, অন্যান্য অনলাইন ব্যবসায়ী ও সাধারণ জনগণকে হয়রানি শুরু হয়।
এরা অনেকের কাছে মোটা অংকের টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন বলে অভিযোগ উঠে।
গত ২৭ মে সাইবার টিম বগুড়া সদরের শিকারপুরে মাস্টার বিড়ি কারখানায় যান। সেখাবে জাল ব্যান্ডরোল থাকার দাবি করে মালিক হেলালুর রহমান হেলালকে হয়রানি করা হয়। তাকে বলা হয়, পুলিশ সুপারকে ম্যানেজ করতে পারলে মামলা হবে না। বিনিময়ে দুই কোটি টাকা দাবি করা হয়।
চাপের মুখে ব্যবসায়ী হেলাল ২৫ লাখ টাকা দিতে রাজি হন। তাৎক্ষণিকভাবে ১০ লাখ ও এক সপ্তাহ পরে অবশিষ্ট ১৫ লাখ টাকা দেওয়ার কথা হয়। তিনি নয় লাখ টাকা সংগ্রহ করে রাতেই পুলিশ কর্মকর্তাদের দেন।
অবশিষ্ট টাকার জন্য সাইবার টিম ওই ব্যবসায়ীকে চাপ দিতে থাকে। বিব্রত ব্যবসায়ী হেলাল ১৩ জুলাই পুলিশ সুপার আলী আশরাফ ভুঞার সাথে সাক্ষাৎ করে লিখিত অভিযোগ দেন। তখন সাইবার পুলিশের কর্মকর্তারা চাঁদাবাজির ওই নয় লাখ টাকা ফেরত দেন।
তাৎক্ষণিকভাবে গঠিত তিন সদস্যের তদন্ত কমিটির রিপোর্ট পেয়ে পুলিশ সুপার গত ২৬ জুলাই সাইবার ইউনিটের ইনচার্জ ইন্সপেক্টর এমরান মাহমুদ তুহিনকে রাজশাহী রেঞ্জে সংযুক্ত ও এসআই শওকত আলমকে সাময়িক বরখাস্ত করেন।
পরে তাদের রাজশাহী রেঞ্জ রিজার্ভ ফোর্সে বদলি করা হয়েছে। যদিও শাস্তিপ্রাপ্তরা তাদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ দৃঢতার সাথে অস্বীকার করে বলেন, এটা তাদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র। এদের শাস্তি দেওয়ার পরপরই কথিত পুলিশরা গাঢাকা দিয়েছেন।
বগুড়া শহরে জলেশ্বরীতলা এলাকায় একটি চায়নিজ রেস্তরাঁর মালিক জানান, শহরের মালগ্রামের মামাতো ভাই শাহজাহান আলীর ছেলে সাকিব ঢাকার যাত্রাবাড়ির শিপন নামে একজনের সাথে আউটসোর্সিং ব্যবসা করতেন। পাওনা কমিশন কেটে নেওয়ায় শিপন কথিত পুলিশ জাকারিয়া শিকদারের মাধ্যমে সাইবার টিম প্রধানের সাথে আলোচনা করেন। এর প্রেক্ষিতে জাকারিয়া শিকদারের মাধ্যমে সাকিবের বড় ভাই সোহানকে আটক করা হয়।
সাইবার ইনচার্জ ইন্সপেক্টর তুহিন তাদের জানান, ঢাকা সাইবার ইউনিটে অভিযোগ হয়েছে; টাকা না দিলে মামলা হবে। তখন তাদের বাবা বাধ্য হয়ে সাইবার পুলিশের কর্মকর্তাদের সাথে সমঝোতা করতে বাধ্য হন।
২০১৯ সালের ৩০ জুলাই আপোষনামার মাধ্যমে সাকিবের বাবা শাহজাহান আলী সাইবার পুলিশকে চার লাখ ৮৪ হাজার ৭১০ টাকা দেন। ঠিক এক বছর পর ২০২০ সালের আগস্টে কথিত পুলিশ জাকারিয়া শিকদার ও তার লোকজন সাকিবের বিরুদ্ধে আবারো আউটসোর্সিংএর মাধ্যমে শিপনের টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ তোলেন।
দ্বিতীয় দফায় শাহজাহান আলী সাইবার পুলিশকে আরো প্রায় তিন লাখ টাকা দিতে বাধ্য হন। সবমিলিয়ে প্রায় ১০ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়।
রেস্তরাঁ ব্যবসায়ী আরো জানান, সে সময় বিধি মোতাবেক সাকিবের ব্যাংক হিসাবের তথ্য দিতে অস্বীকৃতি জানালে সোনালী ব্যাংক বগুড়া বাজার শাখার ব্যবস্থাপককে হেনস্থা করা হয়েছিল।
বগুড়া সাইবার টিমের বিরুদ্ধে তাদের পছন্দের ব্যক্তিকে পুলিশের মত আইডি কার্ড দিয়ে আউটসোর্সিং ব্যবসায়ী ও বিভিন্ন শ্রেণি পেশার মানুষকে হয়রানির অভিযোগ রয়েছে।
তবে হয়রানির ভয়ে কেউ মুখ খোলার সাহস করছেন না।
সাধারণ জনগণকে পুলিশের মত আইডি কার্ড প্রদান প্রসঙ্গে কয়েকজন পুলিশ সুপার ও ডিআইজি পদমর্যাদার কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, তাদের আইডি কার্ড আবেদনের মাধ্যমে সদর দফতর থেকে নিতে হয়। পুলিশ সুপার কাউকে আইডি কার্ড দিতে পারেন না। এটা অনেক বড় অপরাধ।
বগুড়া ডিবি পুলিশের সাবেক ইনচার্জ ইন্সপেক্টর আসলাম আলী জানান, তিনি জাকারিয়া ও তন্ময়কে অফিসে দেখেছেন। তবে তাদের পুলিশের আইডি কার্ড আছে কি না, তা জানা নেই।
একই অফিসে উঠাবসা ও বিভিন্ন অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকলেও ডিবির বর্তমান ইনচার্জ ইন্সপেক্টর আবদুর রাজ্জাক জানান, তিনি তাদের কখনও দেখেননি বা চেনেন না।
শাস্তিপ্রাপ্ত ইন্সপেক্টর এমরান মাহমুদ তুহিন ও এসআই শওকত আলমও ওই দু’জনকে চিনতে পারেননি।
এসব প্রসঙ্গে বগুড়ার বিদায়ী পুলিশ সুপার আলী আশরাফ ভুঞা জানান, জাকারিয়া শিকদার ও তন্ময় সাইবার পুলিশের ট্রেইনার; ওরা সারাদেশে ট্রেনিং দিয়ে থাকেন।
তিনি তাদের পুলিশের আইডি কার্ড দেননি। কেউ এমন কার্ড তৈরি করে তাদের ক্ষতি করতে মিথ্যাচার করছেন। কার্ডটা পেলে তদন্ত করে বের করা হবে কে এটা ইস্যু করেছে।
তিনি আরো বলেন, সাইবার পুলিশের এসআই শওকত আলম ও রিজার্ভ অফিসের এএসআই ফারুক হোসেন ২০১৯ সালের ৪ জুলাই কনস্টেবল নিয়োগে ঘুষ গ্রহণের জন্য স্ট্যান্ড রিলিজ হননি; এর কোন ভিত্তি নেই। সদর দফতরের নির্দেশে তাদের বদলি করা হয়েছিল। আর এর কারণ সংশ্লিষ্টরা জানেন।