বাংলা হেডলাইনস খুলনা প্রতিনিধি: চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে নিহত ফায়ার সার্ভিস সদস্য ফায়ার ফাইটার মো: শাকিল তরফদার (২৩) তার মাকে হজ করতে নিয়ে যেতে চেয়েছিলেন।
তিনি আগামী ঈদুল আযহায় গ্রামের বাড়িতে আসার কথাও বলেছিলেন মাকে। কিন্তু সেটি শুধু স্বপ্নই রয়ে গেল, পূরণ হলো না, এটিই এখন মায়ের আক্ষেপ। তার আদরের সন্তান এখন আর জীবিত নেই- এটি কোনোভাবেই মানতে পারছেন না মা জেসমিন বেগম।
খুলনার বটিয়াঘাটা উপজেলার সুখদাড়া গ্রামে নিহত শাকিল তরফদারের গ্রাম। গ্রামের তরফদার বাড়ি এখন সবার কেন্দ্রবিন্দু। রোববার সকাল থেকেই আত্মীয়-স্বজন বন্ধু বান্ধব এবং প্রতিবেশীরা শাকিল এর খবর নিতে শুরু করে। বিকেল নাগাদ শাকিল এর মৃত্যুর খবর গ্রামে পৌঁছে যায়। এরপর থেকে মূলত শুরু হয় শোকের মাতম। শোকাহত পরিবেশ বিরাজ করছে তরফদার বাড়ি।
সোমবার সকালে শাকিলদের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, বৃদ্ধ বাবা আব্দুস সাত্তার তরফদার এবং মা জেসমিন বেগমসহ আত্মীয়-স্বজনরা কান্নায় ভেঙে পড়েছেন। শুধুমাত্র ছেলের কথা স্মরণ করে তারা আক্ষেপ করছেন।
জানতে চাইলে শাকিলের বাবা আব্দুস সাত্তার তরফদার বলেন, গত সাড়ে তিন বছর আগে ছেলে শাকিল ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সে ফায়ারম্যান হিসেবে যোগদান করে। এরপর থেকেই সে পরিবারের সকল দায় দায়িত্ব বহন করত। অবিবাহিত শাকিলকে বিবাহ দেওয়ার জন্য প্রস্তুতি চলছিল। সোমবারও (০৬ জুন) তার জন্য মেয়ে দেখার জন্য একটি বাড়িতে যাওয়ার কথা ছিল তাদের। এমনকি বাড়ির সামনে ফাঁকা জায়গা ভরাট করে সেখানে পাকা ভবন করতে চেয়েছিল শাকিল।
কিন্তু স্বপ্ন বাস্তবায়ন হয়নি। এখন প্রধানমন্ত্রীর কাছে তার আবেদন- তিনি যেন তাদের পাশে থাকেন। একই সঙ্গে তিনি সীতাকুণ্ডের দুর্ঘটনাকবলিত প্রতিষ্ঠান মালিকের শাস্তি দাবি করেন।
শাকিলের ভাই ফায়ার সার্ভিসে কর্মরত মো: আসাদুজ্জামান রিপন বলেন, তিনি অস্থায়ীভাবে কর্মরত রয়েছেন। তার ছোট ভাই শাকিল মূলত পরিবারের ভরণপোষণ ও মা-বাবাকে দেখা শোনা করতো। তাকে নিয়ে পরিবারের সবার একটি স্বপ্ন ছিল। যা আজ মিথ্যা হয়ে গেল।
শাকিবের মামা খালিদ হোসেন বলেন, পরিবারটি যাতে ভালোভাবে টিকে থাকতে পারে সেজন্য সরকারের পদক্ষেপ নেয়া উচিত।
পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, ২০০০ সালের ৭ মার্চ জন্মগ্রহণ করেন শাকিল তরফদার। তিনি বাবা-মায়ের তিন ছেলের মধ্যে ছোট। তার বড় ভাই মনিরুজ্জামান মনি তরফদার একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত। তার মেজ ভাই আসাদুজ্জামান রিপন তরফদার ফায়ার সার্ভিসে কুক হিসেবে কর্মরত। তিনি বর্তমানে খুলনার বটিয়াঘাটা উপজেলা ফায়ার সার্ভিস অফিসে দায়িত্ব পালন করছেন।
শাকিল ২০১৬ সালে ডুমুরিয়া উপজেলার গজেন্দ্রপুর মামা বাড়ি থেকে সেখানকার জিকে এসকে আদর্শ মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে এসএসসি এবং ২০১৮ সালের বটিয়াঘাটা সরকারি মহাবিদ্যালয় থেকে এইচএসসি পাশ করেন। তিনি ২০১৯ সালের ২০ মে ফায়ারম্যান হিসেবে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স এ যোগদান করেন।
এদিকে শাকিল এর জানাযা এবং দাফনের জন্য তার পরিবারের পক্ষ থেকে প্রস্তুতি নেয়া হয়েছে। কিন্তু লাশ আসার অপেক্ষায় রয়েছেন তারা। প্রাপ্তি সাপেক্ষে জানাজা এবং দাফন সম্পন্ন হবে বলে জানিয়েছেন তার পরিবারের সদস্যরা।
প্রসংগত,শাকিল তরফদার ছিলেন সীতাকুণ্ডের কুমিরা ফায়ার সার্ভিসের ফায়ারম্যান।
শাকিলের মৃত্যুর খবর শোনার পর থেকে বারবার মূর্ছা যাচ্ছেন মা। বাবা স্বাভাবিক থাকলেও কথা বলছেন না। মৃত্যুর কথা নিশ্চিত হওয়ার পর শাকিলের বড় ভাই মনি তরফদার স্থানীয় কয়েকজনকে সঙ্গে নিয়ে চট্টগ্রামে গেছেন। এখনও ভাইয়ের লাশ বুঝে পাননি মনি।
শাকিলের মা জেসমিন বেগম জানিয়েছেন, আগুন নেভাতে যাওয়ার আগে শাকিল তার মাকে ফোন করেছিলেন। এ সময় মায়ের কাছে দোয়া চেয়েছিলেন। আগামী কোরবানির ঈদে বাড়ি এসে খুলনা জোনের মনিরামপুর ফায়ার সার্ভিসের অফিসে যোগদানের কথা বলেছিলেন মাকে। রোজার ঈদে শাকিল সুখদারার বাড়িতে পরিবারের সঙ্গে ঈদ করেছিলেন। তার মৃত্যু কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছেন না।
সুখদারা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. জাকির হোসেন বলেন, শুরু থেকেই শাকিল সীতাকুণ্ডের কুমিরা অফিসে দায়িত্ব পালন করছেন। চাকরির প্রথমবার শাকিলের মনিরামপুরে বদলি হওয়ার কথা ছিল। কোরবানির ঈদের পর সেখানে যোগদানের কথা ছিল। কিন্তু তার আগেই শাকিল পৃথিবী থেকে বিদায় নিলেন। তার মৃত্যুতে পরিবার ও প্রতিবেশীদের মাঝে শোকের ছায়া নেমেছে।