বাংলা হেডলাইনস : জুলাই জাতীয় সনদের সংবিধান সম্পর্কিত প্রস্তাব বাস্তবায়নে সংবিধান সংস্কার পরিষদের অধিবেশন ডাকার বিষয়ে সংসদে আনা বিরোধী দলের নোটিস ঘিরে বিতর্ক হয়েছে।
নোটিসের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের বক্তব্যের এক পর্যায়ে হট্টগোলও হয়।
ঈদের ছুটির পর রোববার জাতীয় সংসদে প্রশ্নোত্তর পর্ব শেষে পয়েন্ট অব অর্ডারে দাঁড়িয়ে বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান নোটিসটি উত্থাপন করলে এর বৈধতা নিয়ে তর্ক-বিতর্ক শুরু হয়।
পরে সভাপতির আসনে থাকা ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামাল মঙ্গলবার দুই ঘণ্টা আলোচনা হবে বলে রুলিং দেন।
জুলাই জাতীয় সনদের সংবিধান সম্পর্কিত ৪৮টি সংস্কার প্রস্তাবের বাস্তবায়ন কীভাবে হবে, তা ঠিক করে দিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ‘জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ’ জারি করা হয়। আর সেসব সংস্কার প্রস্তাবের বাস্তবায়নের বিষয়ে জনগণের সম্মতি নিতে ১২ ফেব্রুয়ারি সংসদ নির্বাচনের দিন হয় গণভোট।
গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়ী হওয়ায় ‘জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ’ অনুযায়ী, বর্তমান সংসদের সদস্যদের সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবেও ভূমিকা রাখার কথা। সংসদের মতই সংসদ নির্বাচনের ফল ঘোষিত হওয়ার ৩০ পঞ্জিকা দিবসের মধ্যে পরিষদের প্রথম অধিবেশন ডাকার কথা।
জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন আদেশ অনুসারে, নির্বাচনে জয়ী ব্যক্তিরা একই দিনে সংসদ সদস্য ও সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে দুটি শপথ নেওয়ার কথা ছিল। গত ১৭ ফেব্রুয়ারি সে অনুযায়ী প্রস্তুতি রেখেছিল সংসদ সচিবালয়।
জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক পার্টিসহ (এনসিপি) বিরোধী দলের সদস্যরা সেদিন দুটি শপথ নিলেও বিএনপির এমপিরা সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নেননি। ফলে নির্ধারিত সময়ে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠিত হয়নি।
রোববার বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান কার্যপ্রণালী-বিধির ৬২ বিধি অনুসারে জনগুরুত্বসম্পন্ন বিষয়ে মুলতবি প্রস্তাব উত্থাপনের নোটিস দেন।
তিনি বলেছেন, বিষয়টি তিনি ১৫ মার্চ সংসদে উত্থাপন করেছিলেন। তখন স্পিকার আনুষ্ঠানিক নোটিস দিতে বলেছিলেন।
শফিকুর রহমানের নোটিসে বলা হয়েছে, জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫ এর অনুচ্ছেদ ১০ অনুযায়ী নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সংবিধান সংস্কার পরিষদের অধিবেশন আহ্বান করা হয়নি।
নোটিসে বলা হয়, জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন আদেশ ও গণভোটের রায় বাস্তবায়নের লক্ষ্যে আইনে বর্ণিত সময়সীমার মধ্যে সংস্কার পরিষদের অধিবেশন আহ্বান না হওয়ায় ‘জাতির প্রত্যাশাকে পাশ কাটিয়ে এ ধরনের অচলাবস্থা সৃষ্টি’ হয়েছে।
আদেশের ১০ অনুচ্ছেদ তুলে ধরে ফল ঘোষণার ৩০ পঞ্জিকা দিবসের মধ্যে সংসদের মতো সংবিধান সংস্কার পরিষদের অধিবেশন আহ্বানের বিধানটি স্মরণ করিয়ে দেন বিরোধী দলের নেতা।
পর পয়েন্ট অব অর্ডারে দাঁড়িয়ে নোটিস উত্থাপন ও আলোচনার দাবি তোলার পক্ষে যুক্তি দিয়ে শফিকুর রহমান বলেন, ১৫ মার্চ তিনি একই বিষয়ে পয়েন্ট অব অর্ডারে দাঁড়িয়ে কথা বলেছিলেন। স্পিকার তাকে নোটিস দিতে বলেছিলেন। সেই অনুযায়ী নোটিস দিয়ে তিনি আলোচনার দাবি জানাচ্ছেন।
তবে সরকারি দলের পক্ষ থেকে চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম বলেন, দিনের কার্যসূচি অনুযায়ী আগে প্রশ্নোত্তর ও বিধি-৭১ এর নোটিসের ওপর আলোচনা শেষ করতে হবে। এরপর অন্য বিষয়ে আলোচনা হতে পারে।
জবাবে বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, প্রশ্নোত্তরের পরই এ আলোচনা হওয়ার কথা। সে অনুযায়ীই তিনি দাঁড়িয়েছেন।
এরপর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ কথা বলতে চাইলে বিরোধী দলের সদস্যরা আপত্তি তোলেন। তবে তাকে ফ্লোর দেওয়া হয়।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, “বিরোধীদলীয় নেতা একটি প্রস্তাব উত্থাপন করেছেন। সরকারি দল বিধি মোতাবেক আলোচনার সুযোগ দেওয়ার পক্ষে।”
তিনি বলেন, রীতি অনুযায়ী প্রশ্নোত্তর ও ৭১ বিধির নোটিসের পর মুলতবি প্রস্তাবের আলোচনা হতে পারে। স্পিকারকে বিধি অনুযায়ী এগিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
এ সময় বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম বলেন, “সংসদের কার্যক্রম দেখে মনে হচ্ছে কীভাবে এই সংসদ গঠিত হয়েছে, তা সবাই ভুলে যাচ্ছেন। সংসদ নির্বাচনের পাশাপাশি গণভোটও হয়েছিল। কিন্তু এখন কার্যক্রম দেখলে মনে হয় এ ধরনের কিছুই হয়নি।”
তিনি বলেন, এটি ‘সবচেয়ে বেশি জনগুরুত্বপূর্ণ’ বিষয় এবং নিয়মিত কার্যক্রমের আগে এটির সুরাহা হওয়া ‘উচিত’।
চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম বলেন, স্পিকার চাইলে অনুমতি দিতে পারেন, তবে প্রশ্নোত্তর ও ৭১ বিধির বিষয়গুলোও গুরুত্বপূর্ণ এবং সংসদ সদস্যদের অধিকার। এ দুই কার্যসূচির জন্য দুই ঘণ্টা বরাদ্দ রয়েছে।
পরে ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামাল বলেন, তিনি বিরোধী দলের নোটিস পেয়েছেন এবং সংসদের রীতি মেনে বিধি-৭১ এর নোটিসগুলোর ওপর আলোচনা শেষে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত দেবেন।
নোটিস উত্থাপনের পর আইনমন্ত্রী আসাদুজ্জামান বলেন, “যৌক্তিক এবং সময়োপযোগী একটি প্রস্তাব মনে করছি। এ বিষয়টি আলোচনার দাবি রাখে, ওনাদের পক্ষ থেকেও আলোচনা হবে, আমাদের পক্ষ থেকেও আলোচনা হবে। আমরা আলোচনা করতে চাই, তবে আলোচনার আগে একটু সময় প্রয়োজন।”
তিনি বলেন, এ বিষয়ে আলোচনা করতে গেলে সংসদ সদস্যদের সামনে বাংলাদেশের সংবিধান, জুলাই জাতীয় সনদ, বাস্তবায়ন আদেশ এবং গণভোট অধ্যাদেশের কপি থাকা দরকার।
আইনমন্ত্রীর ভাষায়, “আমরাও চাই, জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন হোক এবং আমরা জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের পথ ধরে হেঁটে চলেছি।”
তবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ পরে বিধিগত আপত্তি তুলে বলেন, বিরোধীদলীয় নেতা ৬২ বিধিতে নোটিস দিলেও এটি জরুরি জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে নোটিস দেওয়ার ক্ষেত্রে ৬৮ বিধিতে যাওয়ার বিষয় আছে।
তিনি বলেন, “প্রস্তাবটি নিয়ে আমি আপত্তিও তুলছি না, অনাপত্তিও তুলছি না। কিন্তু আলোচনা হবে, নোটিসটাই তো বৈধ হয় নাই। বৈধভাবে আগে নোটিস হলে তারপরে আলোচনা হবে।”
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যের সময় বিরোধী দলের সদস্যরা দাঁড়িয়ে প্রতিবাদ জানান এবং সংসদে হট্টগোল তৈরি হয়। এক পর্যায়ে তিনি ডেপুটি স্পিকারের কাছে ‘প্রোটেকশন’ চান।
পরে তিনি বলেন, কার্যপ্রণালী-বিধির ৬৩ অনুযায়ী এমন কোনো প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা হতে পারে না, ‘যার প্রতিকার কেবল আইন প্রণয়নের মাধ্যমে হতে পারে’।
সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, সংবিধান সংশোধনের প্রশ্নে সংসদীয় ভাষায় সংবিধান ‘প্রণীত হবে অথবা রহিত হবে অথবা স্থগিত হবে অথবা সংশোধিত হবে’ এবং বিলের মাধ্যমে সংবিধান সংশোধনের পথেই এগোনো উচিত।
রাষ্ট্র সংস্কার আলোচনায় বিএনপির পরিচিত মুখ সালাহউদ্দিন আহমদ সংবিধান সংশোধনে একটি ‘কনস্টিটিউশন রিফর্ম কমিটি’ গঠনের প্রস্তাবও দেন। যেখানে সরকারি দল, বিরোধী দল, স্বতন্ত্র সদস্যসহ সবার মতামত নেওয়া যেতে পারে বলেছেন তিনি।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, “আমরা সমঝোতার ভিত্তিতে জাতীয় সংসদে এমন একটি সংবিধান সংশোধন করতে চাই—যেই দলিলটা জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানের শহীদের আকাঙ্ক্ষাকে ধারণ করতে পারে।”
এরপর আবার ফ্লোর নিয়ে বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, তিনি চান আগে সংসদ মূলতবি করে আলোচনা হোক, তারপর বিষয়টি নিয়ে কথা হবে।
সব পক্ষের বক্তব্য শোনার পর ডেপুটি স্পিকার রুলিং দেন, কার্যপ্রণালী-বিধির ৬৫(২) অনুযায়ী ৩১ মার্চ, মঙ্গলবার দিনের কার্যসূচি শেষ করে এ বিষয়ে দুই ঘণ্টা আলোচনা হবে।
রুলিংয়ের পরও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নোটিস সংশোধনের বিষয়টি তুলে ধরতে চাইলে ডেপুটি স্পিকার তাকে বসতে বলেন। এক পর্যায়ে তার মাইক বন্ধ করে দেওয়া হয়।
ডেপুটি স্পিকার বলেন, তিনি তার সিদ্ধান্ত দিয়ে দিয়েছেন এবং মঙ্গলবার আলোচনার জন্য দুই ঘণ্টা সময় থাকবে।
এরপরও কিছু সময় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও বিরোধী দলের কয়েকজন সদস্যকে মাইক ছাড়া কথা বলতে দেখা যায়।
পরে বিদ্যমান জ্বালানি সংকট ও যুদ্ধকেন্দ্রিক অর্থনীতির প্রেক্ষাপটে করণীয় বিষয়ে জামায়াতের সংসদ সদস্য নজিবুর রহমান আরেকটি মুলতবি আলোচনার নোটিস দিলেও তা গ্রহণ করা হয়নি।
পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে পরে ডেপুটি স্পিকার রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর আলোচনার জন্য সরকারদলীয় সদস্য খন্দকার আবু আশফাককে আহ্বান করেন।
এরপর চিফ হুইপ ও বিরোধীদলীয় চিফ হুইপকে বিষয়টি নিয়ে সংক্ষিপ্ত বক্তব্যের সুযোগ দেওয়া হয়।