বাংলা হেডলাইনস: প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, প্রতিবছর বাংলাদেশ থেকে চিকিৎসার জন্য প্রায় ৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বিদেশে চলে যাচ্ছে। দেশের মানুষের চিকিৎসার জন্য বিদেশমুখিতা কমাতে চিকিৎসকদের প্রতি জনগণের আস্থা ও বিশ্বাস আরও দৃঢ় করার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেছেন, এটি কোনো আইন বা প্রতিষ্ঠান দিয়ে সম্ভব নয়; চিকিৎসকদের মানবিক আচরণ ও মানসম্মত চিকিৎসাসেবার মাধ্যমেই তা অর্জন করতে হবে।
শনিবার ঢাকা মেডিকেল কলেজের ৮১তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত ‘ডিএমসি ডে-২০২৬’-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ঢাকা মেডিকেল কলেজ শুধু একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নয়, বরং বাংলাদেশের ইতিহাসের জীবন্ত সাক্ষী। ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ, স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন এবং ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলন—প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ে এই প্রতিষ্ঠানের চিকিৎসক, শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও কর্মকর্তা-কর্মচারীরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। এখান থেকে শুধু সেরা চিকিৎসকই নয়, এমন মহৎ মানুষ তৈরি হয়েছেন, যারা অন্যের জীবন রক্ষায় নিজেদের স্বার্থ বিলিয়ে দিতেও কুণ্ঠাবোধ করেননি।
তিনি বলেন, দেশের মানুষের কাছে, বিশেষ করে রাজধানীর মানুষের কাছে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল সার্বক্ষণিক একটা নির্ভরতার প্রতীক। একজন চিকিৎসকের স্টেথোস্কোপের এক প্রান্তে যেমন তার কানে থাকে, ঠিক অন্য প্রান্তে তখন স্পন্দিত হয় একটা মানুষের জীবন। চিকিৎসক ও রোগীকে ঘিরে আবর্তিত হয় একটা পরিবারের অগাধ বিশ্বাস।
তারেক রহমান বলেন, এমন একজন মানুষ হিসেবে আমরা আপনাদের চিন্তা করি, যার কাছে আমরা ভরসা পাই; ভরসা পাই একজন পরম বন্ধু হিসেবে। বিপদে পড়লেই কিন্তু মানুষ আপনাদের কাছে যায়। একজন মানুষ বিপদে পড়ে যখন আরেকজন মানুষের কাছে যায়, তখন কিন্তু সে সেই মানুষটাকে তার ভরসার আশ্রয়স্থল মনে করে বলেই তার কাছে যায়। চিকিৎসকগণই রোগ-শোকে কাতর মানুষের পরম বন্ধু হয়ে ওঠেন এবং এই কথাটি আমি আমার জীবনেও উপলব্ধি করেছি।
নিজের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, তার মায়ের জীবনের শেষ সময়ে দেশের চিকিৎসকেরা যে আন্তরিকতা ও মানবিকতার সঙ্গে সেবা দিয়েছেন, তা পৃথিবীর কোনো উন্নত হাসপাতালেও অর্থ দিয়ে পাওয়া সম্ভব নয়।
তারেক রহমানের কথায়, ‘এ দেশেরই প্রখ্যাত কয়েকজন চিকিৎসক আমার মাকে অনেক বছর ধরে চিকিৎসা দিয়েছেন। প্রত্যেকটি মুহূর্তে উনারা তাকে টেক কেয়ার করেছেন। উনর মৃত্যুর কিছুদিন আগে উনাকে বিদেশে নেওয়া হয়েছিল।’
তারপর আবারও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে বিদেশে নেওয়া হবে কিনা, তা নিয়ে নিজেদের মধ্যে তর্ক-বিতর্ক হচ্ছিল জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আপনারা উনাকে (বিদেশে) নিতে চাচ্ছেন, কিন্তু এখানকারা চিকিৎসকরা উনাকে যে সেবাটা দিচ্ছেন, ২৪টা ঘণ্টার প্রতিটি মুহূর্ত আমি দেখেছি।
‘হ্যাঁ, বিদেশে গেলে হয়তো টেকনিক্যাল সাপোর্টটা ভালো পাওয়া যাবে, ভালো ইকুইপমেন্ট হয়তো আছে, আরো হয়তো অ্যাডভান্স ইকুইপমেন্ট (আধুনিক যন্ত্রপাতি) আছে…, কিন্তু এই যে হিউম্যান টেক কেয়ার (মানুষের দেওয়া পরিচর্যা), আমি মনে করি না এটা বিদেশে গেলে কোনোভাবেই পাওয়া যেত। তার জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত যে সেবাটা উনার দিয়েছেন, পৃথিবীর যত ভালো হাসপাতালই হোক, যতই অর্থ দিয়ে হোক, এটা পাওয়া যেত না। সেজন্য ব্যক্তিগতভাবে আমি সেই মানুষগুলার কাছে অত্যন্ত কৃতজ্ঞ।’
এ সময় স্বাস্থ্যসেবা শক্তিশালী করতে সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগের কথা তুলে ধরে সরকারপ্রধান জানান, হাসপাতালের নিরাপত্তা জোরদার করতে চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানে আনসার সদস্য মোতায়েনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে ৫ হাজার এমবিবিএস চিকিৎসক নিয়োগের কার্যক্রম শুরু হয়েছে। নার্স, মেডিকেল টেকনোলজিস্ট, ফার্মাসিস্ট, মিডওয়াইফসহ বিভিন্ন স্বাস্থ্য পেশাজীবীর শূন্য পদ দ্রুত পূরণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এছাড়া নিরাপদ মাতৃত্ব নিশ্চিত করতে আরও ২৫ হাজার মিডওয়াইফ নিয়োগের পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানান তিনি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘প্রিভেনশন ইজ বেটার দ্যান কিওর’ নীতিকে সামনে রেখে সরকার প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্যসেবায় গুরুত্ব দিচ্ছে। এ লক্ষ্যে প্রায় এক লাখ ‘হেলথকেয়ার’ কর্মী নিয়োগের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে, যাদের ৮০ শতাংশই নারী হবেন। তারা ঘরে ঘরে গিয়ে মানুষকে স্বাস্থ্য সচেতনতা, জীবনযাপন ও খাদ্যাভ্যাস সম্পর্কে পরামর্শ দেবেন। এর ফলে আগামী ১০ বছরে অসংক্রামক রোগ কমবে, হাসপাতালের ওপর চাপও হ্রাস পাবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
তিনি জানান, চলতি অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে স্বাস্থ্য খাতে প্রায় ৭০ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে, যা জিডিপির প্রায় ১ দশমিক ২ শতাংশ। আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ জিডিপির ৫ শতাংশে উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
চিকিৎসা ব্যয় কমাতে সরকার বিভিন্ন চিকিৎসা সরঞ্জাম ও ওষুধের কাঁচামালের ওপর কর, শুল্ক ও ভ্যাট কমিয়েছে বলেও জানান প্রধানমন্ত্রী। এর ফলে ডায়ালাইসিস ফিল্টার, হার্টের স্টেন্ট, হার্টের ভাল্ব, পেসমেকার, চোখের লেন্স এবং ক্যান্সারের ওষুধের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে কমবে এবং রোগীরা সরাসরি উপকৃত হবেন।
গ্রামীণ স্বাস্থ্যসেবা উন্নয়নের অংশ হিসেবে উপজেলা পর্যায়ের ৫১ শয্যার হাসপাতালগুলোকে ১০১ শয্যায় উন্নীত করার পরিকল্পনার কথা জানান তিনি। এসব হাসপাতালে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ নিশ্চিত করতে সোলার বিদ্যুৎ ও স্টোরেজ ব্যবস্থা চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
শিশুস্বাস্থ্য সেবার প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বরিশাল, রাজশাহী, রংপুরসহ দেশের পাঁচটি ২০০ শয্যার শিশু হাসপাতাল আগামী সেপ্টেম্বরের মধ্যে চালু করার লক্ষ্য নিয়ে কাজ চলছে। এগুলো চালু হলে বিশেষায়িত শিশু চিকিৎসার জন্য অনেক পরিবারকে আর ঢাকায় আসতে হবে না।
হাসপাতালে মেডিকেল বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও পরিচ্ছন্নতার বিষয়ে চিকিৎসক, শিক্ষার্থী ও সংশ্লিষ্ট সবার সহযোগিতা কামনা করে তিনি বলেন, হাসপাতাল পরিষ্কার রাখা শুধু পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের দায়িত্ব নয়; এটি সবার সম্মিলিত দায়িত্ব। এ ক্ষেত্রে সচেতনতা ও দায়িত্ববোধ বাড়ানোর আহ্বান জানান তিনি।
গবেষণা, আধুনিক চিকিৎসা প্রযুক্তি ও আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণের পরিবেশ গড়ে তুলতেও সরকার কাজ করছে বলে জানান প্রধানমন্ত্রী।
বক্তব্যের শেষাংশে চিকিৎসকদের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী বলেন, প্রতিবছর চিকিৎসার জন্য বাংলাদেশ থেকে প্রায় ৫ বিলিয়ন ডলার বিদেশে চলে যাচ্ছে। বহু মানুষ চিকিৎসার জন্য বিদেশে গিয়ে দেশের মূল্যবান বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় করছেন।
তিনি বলেন, আসুন, আমরা এমন একটি স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তুলি, যেখানে দেশের মানুষ নিজেদের চিকিৎসকদের ওপর পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস রাখতে পারবেন। এটি আইন বা কোনো প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে নয়, চিকিৎসকদের মানবিক আচরণ ও সঠিক চিকিৎসা প্রদানের মাধ্যমেই সম্ভব।
তিনি আশা প্রকাশ করেন, দেশের সব মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের চিকিৎসক এবং শিক্ষার্থীরা সম্মিলিতভাবে এমন একটি স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা গড়ে তুলবেন, যেখানে দেশের মানুষ আস্থার সঙ্গে দেশেই চিকিৎসা গ্রহণ করবেন।