বাংলা হেডলাইনস বগুড়া প্রতিনিধিঃ বগুড়ায় কৃষি যন্ত্রপাতি ও যন্ত্রাংশ উৎপাদন বেড়েই চলেছে। শহরে ফুলবাড়ি বিসিক শিল্পনগরী ছাড়াও বিভিন্ন এলাকায় লোহা ও ঢালাই গলিয়ে তৈরি হচ্ছে সেচ কাজের সেন্ট্রিফিউগ্যাল পাম্প, পাওয়ার টিলার, শ্যালো চালিত ডিজেল ইঞ্জিল, রাইস মিল, টিউবওয়েল, ধান, গম, ভুট্টা মাড়াই মেশিন, চাল, হলুদ, মরিচ গুড়া করার মেশিন, লায়নার, পিস্টনসহ বিভিন্ন যন্ত্রাংশ। যা দেশের ৮০ শতাংশ চাহিদা মেটাচ্ছে। সেন্ট্রিফিউগ্যাল পাম্প আশপাশের বিভিন্ন দেশে রপ্তানিও হচ্ছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, স্বাধীনতার অনেক আগে থেকে বগুড়ায় প্রয়োজনীয় বিভিন্ন ধরনের মেশিনের খুচরা যন্ত্রাংশ তৈরি হয়ে আসছে। শহরের ফুলবাড়ি বিসিক শিল্প নগরী, কাটনারপাড়া, সুত্রাপুর, নামাজগড়সহ কিছু এলাকার কারখানায় কিছু যন্ত্রাংশ তৈরি হতো। কৃষি প্রধান উত্তরাঞ্চলে কষি পণ্যের চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় স্বাধীনতার পর এ শিল্পের বিকাশ ঘটতে শুরু করে। পরবর্তী এটি দেশের মধ্যে প্রথম স্থান অধিকার করে। বর্তমানে এ শিল্পের সাথে হাজারো পরিবার সম্পৃক্ত।
এই শিল্পের কাঁচামাল পুরনো লোহা, ঢালাই, রড, নষ্ট তৈজষপত্র, শ্যালো ও পাওয়ার টিলারের অকেজো যন্ত্রাংশ, জাহাজের অংশ, লোহার টুকরা গলিয়ে পাওয়ার টিলারের বিভিন্ন যন্ত্রাংশ, কৃষির জন্য ব্যবহৃত ফলা, শ্যালো মেশিনের যন্ত্রাংশ,পাম্পসহ বিভিন্ন মেশিনের যন্ত্রাংশ তৈরি করা হয়। বগুড়ায় তৈরি এসব যন্ত্রাংশ দেশের বিভিন্ন জেলায় বিক্রি হয়।
বিসিকের অন্যতম বৃহৎ শিল্প প্রতিষ্ঠান গুঞ্জন মেটাল ওয়ার্কশপের সূত্র জানায়, কাঁচামাল হিসেবে পুরোতন লোহা, ঢালাই ও অন্যান্য সামগ্রী সিলিকন,পিগ আয়রন ও হার্ডকোক দিয়ে গলানো হয়। গলানোর পর তা আগেই বালু ও অন্যন্য জিনিস দিয়ে তৈরি মেশিনের যন্ত্রাংশের সাঁচে ঢেলে দেয়া হয়। ঠান্ডা হলে সাঁচ থেকে যন্ত্রাংশ বের করা হয়ে থাকে। কোন কোন যন্ত্রাংশ ঠান্ডা করার জন্য পানিতে দেয়া হয়ে থাকে। পরবর্তীতে এসব যন্ত্রাংশ কিনে লেদ মালিকরা কৃষিপণ্য তৈরি করে থাকেন। শহরের রেলওয়ে কৃষি পণ্যের মার্কেটের বসাক ইঞ্জিনিয়ারিং-এর মালিক বিশ্বজিৎ বসাক জানান, ঢালাই কারখানায় পুরনো লোহা ও ঢালাই গলানোর পর তা আগে তৈরি করা সাঁচে ঢেলে জমানো হয়। পরে সেই জমানো লোহা তারা ওয়ার্কশপে ফিনিশিং করেন। তারা সাঁচে জমানো লোহা ৫৫ থেকে ৬০ টাকা কেজি দরে কেনেন।
মিল্টন ইঞ্জিনিয়ারিং-এর মালিক আজিজার রহমান মিল্টন জানান, ৮০’র দশকে ব্যক্তি উদ্যোগে বগুড়াতেই প্রথম ফাউন্ড্রি শিল্প-কারখানা গড়ে ওঠে। বর্তমানে এখানে প্রায় ২০ ধরনের উন্নত যন্ত্রাংশ তৈরি হয়। এর মধ্যে ফাউন্ড্রি শিল্পকে কেন্দ্র করে এ অঞ্চলে বেশ কিছু ওয়ার্কশপ গড়ে উঠেছে। তিনি জানান, কৃষির জন্য আরও তৈরি হয় পাওয়ার টিলারের লোহার চাকা, শ্যালো মেশিন দিয়ে মাটির গভীর থেকে পানি তুলতে সেন্ট্রিফিউগাল পাম্প, মেশিনের যন্ত্রাংশ পিস্টন, গজল পিন, লাইনার হেডপিট প্রভৃতি। এ ছাড়া বেশ কিছু দিন ধরে তৈরি হচ্ছে যানবাহনও শিল্প-কারখানার প্রয়োজনীয় ছোট পার্টস। আগে যেসব পার্টস বিদেশ থেকে আমদানি করতে হতো।
বগুড়া ফোরাম অব এগ্রো মেশিনারি ম্যানুফেকচারিং অ্যান্ড প্রসেসিং জোনের সভাপতি গোলাম আযম টিকুল জানান, এ শিল্পের সাথে চার শ্রেণির ব্যবসায়ী জড়িত। এক ধরনের ব্যবসায়ী পুরনো লোহা সংগ্রহ করেন। আরে শ্রেণির ব্যবসায়ী তা কেনাবেচা করেন। তৃতীয় ধাপে এসে তা গলিয়ে ফিনিশিং দিয়ে বাজারজাতের জন্য রয়েছে আরেক ধরনের ব্যবসায়ী। সর্বশেষ এসব লোহা ওয়ার্কশপে গিয়ে তৈরি হয় যন্ত্রাংশ। তিনি আরও জানান, বগুড়ায় মেশিনারিজের যন্ত্রাংশ তৈরি করে অর্থনীতিতে ব্যাপক ভূমিকা রাখছে। এ শিল্পের সাথে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় ৫০ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে। আর প্রতি বছর লেনদেন হয়ে থাকে প্রায় ৫০০ কোটি টাকা। স্থানীয়ভাবে সংগ্রহ করায় বিদেশ থেকে আর কাঁচামাল ও এসব যন্ত্রাংশ আমদানি করতে হয় না। বরং বগুড়ায় উৎপাদিত সেন্ট্রিফিউগাল পাম্প ভারত, নেপাল ও ভুটানে রফতানি করা হচ্ছে।
বগুড়া ফাউন্ড্রি ওনার্স এসোসিয়েশনের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি আব্দুল মালেক জানান, বগুড়ায় ইঞ্জিন বাদে সব ধরনের পার্টস তৈরি হয়। এসব পার্টস দেশের প্রায় সব জেলায় কমবেশি বিক্রি হয়। এ শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখতে এখন আরো সরকারি সহযোগিতার পাশাপাশি সহজ শর্তে ঋণ দেয়া আবশ্যক হয়ে পড়েছে।