বাংলা হেডলাইনস বগুড়া: বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রতিবাদে অপারেশনে আসা বগুড়ার মুক্তিযোদ্ধা সামরিক হামলায় নিহত আবদুল খালেক খসরুর নাম রাজাকারের তালিকায় আসায় শুধু তার পরিবার নয়; বগুড়ার মুক্তিযোদ্ধারাও হতবাক হয়েছেন। সকলে বলছেন, মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলে মুক্তিযোদ্ধাকে রাজাকার বানানো হয়েছে; আমরা এ লজ্জা কোথায় রাখবো?
জানা গেছে, মুক্তিযোদ্ধা মন্ত্রণালয়ের দেয়া রাজাকারের তালিকায় মুক্তিযোদ্ধা আবদুল খালেকের নাম রয়েছে রাজশাহী বিভাগের ৯২ নম্বর ক্রমিকে। সেখানে লেখা হয়েছে, নথি নং-ডাব্লিউ-১/৭৩। মামলা নং-৪৩, বগুড়া থানা, তারিখ ২৩/০৬-১৯৭২। তবে মন্তব্যের ঘরে লেখা রয়েছে মামলা প্রত্যাহার।
বগুড়া শহরের মফিজ পাগলার মোড় এলাকার মরহুম আবদুল মালেকের ছেলে আবদুল খালেক খসরুর ভাই মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল মতিন মহব্বত জানান, তারা ৫ ভাইয়ের মধ্যে চার জনই মুক্তিযোদ্ধা। বড় ভাই আব্দুল খালেক খসরু, তার ছোট বিমান বাহিনীর পাইলট আব্দুল মাজেদ খাজা, আব্দুল লতিফ শাহজাহান এবং তিনি আব্দুল মতিন মহব্বত। আব্দুল খালেক খসরু বিমান বাহিনীতে চাকরি করতেন।
একাত্তরে যুদ্ধের সময় তিনি পাকিস্তানি বাহিনী থেকে চলে এসে ভারতে প্রশিক্ষণে যান। সেখানে ইন্সট্রাক্টরের দায়িত্বও পালন করেন। সেখান থেকে দেশে ফিরে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন। ৬ নম্বর সেক্টরের যুদ্ধকালীন কমান্ডার খসরুর মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে ভুমিকা ছিল উল্লেখযোগ্য। মুক্তিযুদ্ধের পর তিনি কোন সার্টিফিকেট নেননি। মুক্তিযুদ্ধের অনেক পর তার সার্টিফিকেট বাসায় পৌঁছে দেয়া হয়েছে। এখনও তিনি ভাতা পাননি। বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকীর সাথে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাদের বাসায় এসেছিলেন। বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রতিবাদে তিনি (খসরু) ভুমিকা রেখেছেন বলে আমাদের দোয়া করে যান। কিন্তু সেই মুক্তিযোদ্ধা এবং বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রতিবাদকারী বড় ভাই খসরু যখন রাজাকারের তালিকায় তখন বিস্ময় প্রকাশ করা ছাড়া আর কি থাকতে পারে।
দেশবাসীতো জেনেছেন, আমার ভাই রাজাকার। এখন প্রত্যাহার করে লাভ কি? প্রত্যাহারের জন্য আবেদনও করব না। মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহনের সময় আমরা ৪ ভাই তো কারো কাছে আবেদন করে যাইনি। তাই আবেদনের প্রশ্ন আসে না।
একজন মুক্তিযোদ্ধা এবং বঙ্গবন্ধুকে স্বপরিবারে হত্যার প্রতিবাদে জীবন দেয়া বীরের নাম রাজাকারের তালিকায় দেখার আগেই আমার মৃত্যুই ভালো ছিলো। তিনি বিস্ময় প্রকাশ করে বলেন, বঙ্গবন্ধুকে স্বপরিবারে হত্যার পর প্রতিবাদে লোক ছিলনা। প্রধানমন্ত্রীও বিভিন্ন সভায় বলেন এ কথাটি। আমার ভাই সেই প্রতিবাদ করতে এসে নিহত হন। আজ তার নাম চলে গেল রাজাকারের তালিকায়। এ লজ্জা রাখব কোথায়?
বগুড়ার মুক্তিযোদ্ধা মোহাম্মদ শোকরানা জানান, স্বাধীনতার পর আমি এবং খসরু বগুড়া জেলা যুবলীগের যুগ্ম সম্পাদক ছিলাম। মুক্তিযুদ্ধও করেছি। বঙ্গবন্ধু হত্যার পর প্রতিবাদের জন্য টাঙ্গাইলে সমবেত হলে সেখানে একটি অপারেশনে খসরুসহ তার সহযোগিরা মারা যান। খসরুর নাম কিভাবে রাজাকারের তালিকায় আসে?
তৎকালিন বগুড়া জেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক ও মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল মোত্তালিব মানিক জানান, বঙ্গবন্ধু হত্যার পর বগুড়া থেকে আমিসহ আব্দুল খালেক খসরু, বাকী ভাই এবং নিহার প্রতিবাদ করার জন্য সংঘবদ্ধ হতে ভারতে গিয়েছিলাম। আমাদের সাথে টাঙ্গাইল ও বিভিন্ন এলাকা থেকেও অনেক মুক্তিযোদ্ধা গিয়েছিল। সেখানে বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকীও গিয়েছিলেন। খসরু ভাই ভারত থেকে এসে বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রতিবাদে টাঙ্গাইলের নিশ্চিন্তপুর চরে অপারেশনের জন্য মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে অবস্থান করছিল। ওই সময় হেলিকপ্টার থেকে সামরিক কমান্ডো হামলায় খসরু ভাইসহ আরও অনেক মুক্তিযোদ্ধা মারা যান। শুধু মুক্তিযোদ্ধা নন, বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রতিবাদকারী মুক্তিযোদ্ধা খসরু ভাইয়ের নাম রাজাকারের তালিকায় আসবে এটা বিশ্বাসই হয়না।