মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর ২০২০, ১২:১৭ অপরাহ্ন

গৌরবময় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে সদা শান্তি কামনা করি

  • আপডেট টাইম : বুধবার, ১৪ অক্টোবর, ২০২০
  • ২৬ দেখা হয়েছে

আমি গর্বিত ছাত্র। কারণ আমি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। আমি গর্বিত কারণ আমি দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম বিদ্যাপীঠের ছাত্র। বাঙালির জাতীয় জীবনে গর্বের সাতটি সোপানের একটি (ভাষা আন্দোলন) বাদে সকল আন্দোলন সংগ্রামে আমার এই প্রাণের বিশ্ববিদ্যালয়ের শ্রদ্ধেয় শিক্ষকমন্ডলী এবং শিক্ষার্থীদের অবদান অতুলীয়।

১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানে আমাদের সবার প্রিয় শিক্ষক ড. জোহা স্যার দেশের কল্যাণে, এদেশের মানুষের কল্যাণে প্রাণ বিসর্জন দিয়ে যে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন তা আমাদের বর্তমান তরুণ প্রজন্মকে গর্বিত করে।

আলোর পথ দেখায়। হিংসা বিভদে ভুলে সবাইকে এক কাতারে দাঁড় করিয়ে কাজ করতে উদ্বুদ্ধ করে। জাতির পিতার কন্যা বঙ্গরত্ন শেখ হাসিনার উন্নয়নের অংশিদার হতে শেখায়।

এই রকম হাজারো শিক্ষকদের আদর্শে উজ্জীবিত হয়ে আজ এই বিশ্ববিদ্যালয়ের অগনিত শিক্ষার্থী সারা দুনিয়ার বহু প্রভাবশালী প্রতিষ্ঠানে সুনামের সাথে নেতৃত্ব দিয়ে যাচ্ছেন।

দেশের অভ্যন্তরে আমাদের অনেক সম্মানিত শিক্ষকমন্ডলী তাঁদের নিজেদের কর্মে, গবেষণায়, মানবিকতায় এবং জ্ঞান সৃজনে অসামান্য অবদান রেখে যাচ্ছেন।

এই বিশ্ববিদ্যালয়ের বহু শিক্ষার্থী আজ আমাদের জাতীয় সংসদে আইনপ্রণেতা হিসেবে জাতির নেতৃত্ব দিয়ে চলেছেন। এসব অর্জন মুছে দেবার ক্ষমতা কারো নেই। 

সম্প্রতি মিডিয়াতে আমাদের এই প্রাণের বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রশাসনিক নানা জটিলতার খবর পড়ে আমরা বিব্রত হই। ইলেক্ট্রনিক অথবা প্রিন্ট মিডিয়ায় যখন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যলয়ের নামে কোন খবর দেখি তখন অন্য সব  খবরের শিরোনাম স্কিপ করে আমার প্রিয় ক্যাম্পাসের খবরটি আগে পড়ি থাকি।

শুধু আমি নয়। আমার মতো এই ক্যাম্পাসের লক্ষ লক্ষ সাবেক ও বর্তমান শিক্ষার্থী দেশে কিংবা দেশের বাহিরে যে যেখানে আছেন সবাই হয়তো আমার মতো একই কাজ করেন।

সুসংবাদে যেমন হৃদয় জুড়িয়ে যায় তেমনি নেতিবাচক সংবাদে মন খারাপ হয়ে যায়। আমরা বিশ্বাস করি প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে নানা মত থাকবেই। সকল ক্ষেত্রে সবাই একমত হবেন এটিও আশা করি না। এতে বিশ্ববিদ্যালয়ের সৃজনশীলতা হারাবে।

মত যতোই হোক না কেন, গবেষণা তহবিলের অপ্রতুলতার কারণে আজও আমাদের বহু শিক্ষককে জ্ঞান সৃষ্টিতে দমানো যায় নি। আমাদের অনেক শিক্ষক নিজস্ব তহবিল থেকে অর্থ ব্যয় করে জনকল্যাণে নিত্য নতুন জ্ঞান ও ধারণার আবিস্কারের উদ্দেশ্যে নিরলস পরিশ্রম করে যাচ্ছেন।

তবে সাম্প্রতিক কিছু ঘটনা আমাদের মনকে নাড়া দিয়েছে। পত্র পত্রিকায় আমাদের প্রতিষ্ঠানের নামে নানামাত্রিক সংবাদ পরিবেশনা আমাদের গৌরবময় ঐতিহ্যকে নাজুক করে তুলেছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ে জ্ঞান সৃজনের পরিবর্তে হিংসা বিভেদ বেড়ে গেছে। অতি সম্প্রতি একটি জাতীয় পত্রিকায় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অনয়িম ও দুর্নীতি বিষয়ক তিন পর্বের একটি খবরে বর্তমান উপাচার্য ড. এম. আবদুস সোবহান স্যারের বিরুদ্ধে নানা অনিয়ম ও অভিযোগের বিষয়ে ৩০০ পৃষ্ঠায় একটি প্রতিবেদন বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন, শিক্ষামন্ত্রণালয়, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় এবং রাষ্ট্রপ্রতির কার্যালয়ে জমা দিয়েছেন মর্মে জানতে পারলাম।

পত্রিকার ওই খবর মারফতে যতটুকু বুঝেছি তা হলো, এই প্রতিবেদনটি বহু পরিশ্রম করে তথ্য সংগ্রহ করে পদ্ধতিগতভাবে এবং শুদ্ধাচার নীতি অনুসরণ করে রচিত।

আরো জানতে পারলাম, প্রতিবেদনটি প্রস্তুত করেছেন সাবেক উপাচার্য ড. মুহাম্মাদ মিজানউদ্দিন স্যারের অনুসারী শিক্ষকগণ। যাঁরাই এটি করুন না কেন, এরকম একটি প্রতিবেদন তৈরী না করে নিজের পেশাগত উৎকর্ষ সাধনে যদি তাঁরা তাঁদের পবিত্র জ্ঞানকে কাজে লাগাতেন নিশ্চয় সেই সময়ে, সেই শ্রমে, সেই ব্যয়ে বাংলাদেশের ও তার মানুষের কল্যাণার্থে একগুচ্ছ নতুন জ্ঞান আবিস্কার হতো। এই দেশ এক ধাপ এগিয়ে যেত।

বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পিছনে প্রত্যাশা ছিলো, দেশের পেশাদার সাংবাদিকগণ আমাদের অধ্যাপকদের পিছনে সারাদিন ঘুরবেন তাঁদের নিত্য নতুন আবিস্কারের খবর সংগ্রহ করার জন্য।

অধ্যাপকদের জ্ঞানগর্ভ আলোচনায় সাংবাদিকগণ আলোকিত হবেন। তাঁদের সৃজনশীলতা নিমগ্ন চিত্রে রচনা করবেন। মানুষ সেগুলো পড়ে নিজেদের জ্ঞান সমৃদ্ধ করবে। সে সবের কিছুই হচ্ছে না।

অথচ অবাক লাগে যখন আমাদের অধ্যাপকগণ নিজেদের স্বার্থ হাসিলের উদ্দেশ্যে ষড়যন্ত্রমূলক সংবাদ ছাপানোর জন্য পত্রিকা অফিসে ঘুরঘুর করে এই কথা শুনে। বিশ্ববিদ্যালয়ের যেকোন সংবাদ লিখার সময় সাংবাদিকদের হাত কাঁপার কথা। সেখানে আজ ঘটছে উল্টো ঘটনা।

বিশ্ববিদ্যালয়ের কতিপয় শিক্ষকগণ সাংবাদিকদের দাওয়াত দিয়ে ঘরে ডেকে সাজিয়ে গুছিয়ে সত্য মিথ্যা সংবাদ পরিবেশনায় সহায়তা করছেন। এখান থেকে আমাদেরকে অবশ্যই শান্তির পথে বেরিয়ে আসতে হবে।

আমি ব্যক্তিগতভাবে শিক্ষক নিয়োগে যোগ্যতার বিচারে বা শুধু ফলাফলের ভিত্তিতে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ মানতে নারাজ। কেননা, আমার এই বিশ্বিবিদ্যলয়ে বহু শিক্ষক একাডেমিক ফলাফল একেবারে অল্পতর নিয়েও আজ দেশীয় ও আর্ন্তজাতিক অঙ্গনে বিখ্যাত এবং বরেণ্য পন্ডিতের খ্যাতি অর্জন করতে সক্ষম হযেছেন।

অনেকে ভালো ফলাফল নিয়ে শিক্ষক হয়েও জাতির জন্য এক বিন্দু পরিমান অবদান রাখতে পারেন নি। আজও যাঁরা একটু কম যোগত্য নিয়ে (নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি মোতাবেক যোগ্য) শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন তাঁদের অনেকে উচ্চতর ডিগ্রি অর্জন ও গবেষণার উল্লেখযোগ্য সম্মান অর্জন করেছেন উদাহরণ আছে।

সেই দৃষ্টিতে আমি বর্তমান উপাচার্য এম. আবদুস সোবহান স্যারের মেয়ে-জামাতা, এম. মিজানউদ্দিন স্যারের মেয়ের নিয়োগকে খারাপ দৃষ্টিতে দেখছি না। দেখতেও চায় না। কারণ তাঁরা যে একাডেমিক যোগ্যতা নিয়ে শিক্ষক হয়েছেন তার থেকে অনেক কম যোগ্যতা নিয়ে শিক্ষক হয়ে আজও তাঁরা এই বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মে নিযুক্ত আছেন। তাঁরা যে অযোগ্য নন তা আগেই উল্লেখ করেছি।

তবে প্রত্যাশা করছি তাঁরা অবশ্যই নিজস্ব অগ্রহে, নিজস্ব উদ্যোগে ভবিষ্যতে উচ্চতর গবেষণায় ভাস্বর হয়ে উঠবেন। আমার এই বাক্যগুলো পড়ে হয়তো বিভাগে যারা প্রথম হয়েছিলেন, তাঁদের মধ্যে যাঁরা আবেদন করে বিভাগের শিক্ষক হতে পারেন নি তাঁরা আমাকে নির্লিপ্ত লেখক বলবেন।

আমি আপনাদের সেই কথা মানতে রাজী। আমি মানতে তখনই রাজী হবো যখন আপনি/আপনারা নিজের যোগ্যতা বলে দেশের প্রথম শ্রেণির অন্য কোন চাকুরি পেয়েও এখানে শিক্ষক হতে এসে প্রত্যাখ্যাত হয়েছেন এমন হলে।

কারণ আপনি প্রথম হয়েছেন বলে বিভাগে চাকরি পাবেন এমন কথা কোথাও লিখা নেই। বিভাগের একই ব্যাচের সব থেকে কম ফলাফলধারী আপনার বন্ধুই যখন বিসিএস দিয়ে প্রশাসন/পুলিশ/পররাষ্ট্র বা অন্য কোন গুরুত্বপূর্ণ ক্যাডার সার্ভিসে যোগ দেন তখন তো এমন প্রশ্ন তোলা সমীচীন হয় না।

কেন প্রশ্ন তোলা হয় না তাঁদেরকে এমন গুরুত্বপূর্ণ ক্যাডার কেন দেওয়া হলো? শুধু শিক্ষক নিয়েগের বেলায় আপনি প্রশ্ন তুলবেন কেন? আসলে মদ্দাকথা হলো, চাকরি যেটাই হোক, চাকরি পেতে লাগে যোগ্যতা!!! সুপ্ত অনেক যোগ্যতা…

শিক্ষক নিয়োগসহ অন্যান্য অনিয়মের কথা লিখতে গিয়ে আমাদের সম্মানিত শিক্ষকমন্ডলীগণ যা করছেন তা শুধু নিজেদেরই গা কাটা যাচ্ছে বলে আমি মনে করি।

আমি দ্ব্যার্থহীন কন্ঠে বলে দিতে চাই, আজও এই বাংলাদেশের কোন মানুষ যখন পরিচয় পায় আপনি রাজশাহী বিশ্বদ্যিালয়ের শিক্ষক, তখন তিনি/তাঁরা মাথা নিচু করে সম্মান প্রদর্শন করে মানসিকভাবে আপনাকে একজন সুপন্ডিতের আসনে অধিষ্ঠিত করে তারপর আপনার সাথে কথা বলে। তাই আমি অনুরোধ রাখতে চাই, বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়োগ পক্রিয়ায় ‘আগের নীতিমালা এবং পরের নীতিমালা’ বলে কোন বিষয় থাকা উচিত নয়। নিয়োগের একমাত্র নীতিমালা হবে ১৯৭৩ সালে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যে নীতিমালা আমাদেরকে উপহার দিয়েছেন সেটি।

শিক্ষক নিয়োগে শুধু এসএসসি, এইচএসসি ও অনার্স-মাস্টার্সের ফলাফল দেখার যুক্তি গ্রহণযোগ্য নয়। ফলাফলের সাথে উচ্চতর ডিগ্রী, গবেষণাকর্ম এবং উদ্ভাবনী ক্ষমতা সর্বাধিক প্রধান্য পাবে এটিই আমাদের কাম্য।

বর্তমান মাননীয় উপাচার্য মহোদয় তাঁর দ্বিতীয় মেয়াদে এই নীতেতে ফিরে গেলে আজ হয়তো এগুলো প্রশ্ন উঠতো না।

আমাদের প্রিয় শিক্ষকগণ আন্দোলন করবেন মানুষের অধিকার নিয়ে। রাষ্ট্রে সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার নিমিত্তে তাঁরা হবেন আলোকবর্তিকা। এরকম শিক্ষক আমাদের অনেক আছেন।

কিন্তু সামান্য স্বার্থের লোভে, পদের মোহে কতিপয় শিক্ষকদের বিভিন্ন ব্যক্তিকেন্দ্রিক দলে উপদলে বিভক্তি, আমতলায় প্রশাসন বিরোধী শ্লোগান দেওয়া, প্রশাসন ভবনে ওঁতপাতা শুধু অনিশ্চয়তার জন্ম দিবে। সৃষ্টি হবে একটি বিশৃঙ্খল পরিবেশের। শিক্ষকদের সম্মান সমাজে অবনমিত হবে। রাষ্ট্র আমাদের বুদ্ধিজীবিদের প্রতি আস্থা হারাবে। 

যে সব দাবিতে আজ ক্যাম্পাস উত্তাল সেগুলো দেশের সাধারণ মানুষের কাছে মূল্যহীন। প্রিয় শিক্ষকবৃন্দ, আপনারা গবেষণায় ফিরে আসুন, ফিরে আসুন আপনার পূর্ণ পেশাদারিত্বে ।

পরিশেষে আমাদের প্রিয় বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্তৃপক্ষের নিকট বিনীত আবেদন, দয়া করে ক্যাম্পাসে শান্তি ফিরিয়ে আনার জন্য যা যা করণীয় করুন। সংববাদপত্রে পাল্টা-পাল্টি নিউজ করা থেকে বিরত থাকতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিন।

সারা দুনিয়ায় ছড়িয়ে ছিঁটিয়ে থাকা রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সকল শিক্ষার্থীদের মাথা উচু করে বেঁচে থাকতে সহায়তা করুন। সবার মঙ্গলের জন্য ক্যাম্পাসে শান্তি ফিরিয়ে আনুন। আমাদের দৃঢ় বিশ্বাস, মাননীয় উপাচার্য ড. এম. আবদুস সোবহান স্যারের দক্ষ নেতৃত্বে বর্তমান প্রশাসন এই কঠিন কাজটি সহজ করে করতে পারবেন। আমাদের প্রাণের ক্যাম্পাস চিরজীবি হোক।

লেখক: মোঃ আবদুল কুদ্দুস , বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক ও গবেষক।

বাংলাহেডলাইনস: লেখাটি লেখকের নিজের মত। বাংলাহেডলাইনস এর মত প্রতিফলিত করে না।

ফেসবুকের মাধ্যমে আমাদের মতামত জানাতে পারেন।

খবরটি শেয়ার করুন..

এই বিভাগের আরো সংবাদ
Banglaheadlines.com is one of the leading Bangla news portals, Get the latest news, breaking news, daily news, online news in Bangladesh & worldwide.
Designed & Developed By Banglaheadlines.com