সাজ্জাদুল তুহিন, বাংলা হেডলাইনস নওগাঁ প্রতিনিধি: নওগাঁর বলিহার রাজবাড়িটি যেন কবি জীবনানন্দের মতো একই কথা কইছে। যে রাজবাড়ি জৌলুস হারিয়ে এখন কেবল স্মৃতি আঁকড়ে বেঁচে আছে।
আর সে স্মৃতি শুধু বেদনার বোঝাই বাড়ায়। রাজবাড়ির সে দেবালয় আছে। কিন্তু সেখানে হয় না আর নিয়মিত পূজা-অর্চনা। দেবতার সন্তুষ্টিতে দেবদাসীদের নৃত্যাঞ্জলি,শঙ্খধ্বনি, পুরোহিতের মন্ত্রপাঠ, ধূপের ধোঁয়া আর খোল-করতালের শব্দ থেমে গেছে বহু বছর আগে। দেবালয়ের দুর্ভেদ্য প্রকোষ্ঠ আর দেয়াল পেরিয়ে দেবদাসীদের হাসিকান্নার শব্দ যেন এখনো ভেসে বেড়ায় বলিহারের ভগ্ন রাজপ্রাসাদের আকাশে-বাতাসে।
তবু দুইশ বছরের স্মৃতি বুকে নিয়ে এখনো দাঁড়িয়ে বলিহার রাজবাড়ি। নওগাঁ জেলা শহরের বালুডাঙ্গা বাসস্ট্যান্ড থেকে মাত্র ১৬ কিলোমিটার দূরে বলিহার ইউনিয়নের বলিহার গ্রামে অবস্থিত ঐতিহ্যবাহী রাজবাড়িটি।
ইতিহাস থেকে জানা যায়, ১৮২৩ সালে জমিদার রাজেন্দ্রনাথ বলিহারে একটি রাজ-রাজেশ্বরী দেবীর মন্দির প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি মন্দিরে রাজেশ্বরী দেবীর অপরূপা পিতলের মূর্তি স্থাপন করেন। বলিহারের ৯ চাকার রথ এ অঞ্চলে প্রসিদ্ধ ছিল। প্রাসাদের কিছুটা দূরেই ছিল বিশাল বাগান। বাগানবাড়িটির সামনের পুকুর ঘাটের একটি ছাদ এখনো দাঁড়িয়ে আছে। এখানে নিয়মিত জলসা বসত। কলকাতা থেকে আনা হতো নামকরা নর্তকীর দল।
রাজ ভবনটি তিনতলা। প্রাসাদ কমপ্লেক্সের মধ্যে অবস্থিত বিশাল দেবালয়টিতে স্থানীয় হিন্দুরা পূজা-অর্চনা করেন। দেবালয়ের ভেতরে অনেক কক্ষ আছে। ভবনের ওপরে ওঠার জন্য দুটি সিঁড়ি আছে। প্রাসাদের সিংহ দুয়ার এখনো বেশ শক্তি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। প্রাসাদের পেছনের মালিপাড়ায় বিশাল আকারের পাশাপাশি দুটি শিব লিঙ্গ আছে। সেখানে পূজা হয়।
জনশ্রুতি আছে, মোগল সম্রাট আকবরের সেনাপতি রাজা মানসিং বারোভূঁইয়াদের দমন করতে এ দেশে আসেন। দীর্ঘপথ অতিক্রম করায় সৈন্যরা ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল। বিশ্রামের জন্য ও গুপ্তচরের মাধ্যমে বারোভূঁইয়াদের খবর জানার জন্য সেনাপতি মানসিং যাত্রা বিরতি করেন বলিহারে। বরেন্দ্রাঞ্চলে সে সময় চলছিল শুষ্ক মৌসুম। বেশি দিন বসে থাকলে সৈন্যরা অলস হয়ে যেতে পারে ভেবে মানসিং সৈন্যবাহিনী দিয়ে সেখানে ৩৩০টি দিঘি ও পুকুর খনন করেন, সেগুলো এখনো রয়েছে গোটা বলিহার এলাকাজুড়ে।
স্থানীয় বাসিন্দা শ্রী নারায়ণ চন্দ্র বলেন, দেশ বিভাগের সময় এবং জমিদারি প্রথা যখন বিলুপ্ত হয়, তখন অন্য সব রাজার মতো বলিহারের রাজার উত্তরাধিকারী বিমেলেন্দু রায় চলে যান ভারতে। এরপর প্রাসাদ ভবনটি রাজ পরিবারের অন্যান্য কর্মচারীরা দেখভাল করতে থাকেন। স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় ও পরে লুট হয়ে যায় রাজবাড়ির বিভিন্ন ঐতিহ্যবাহী মহামূল্যবান নিদর্শন, আসবাবপত্র, দরজা-জানালাসহ বিভিন্ন সামগ্রী।
দর্শনীয় প্রাসাদটির কয়েকটি ভবন কোনোমতে আজও মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে বলিহার রাজাদের ঐতিহ্যের জানান দিচ্ছে।
বর্তমানে এলাকার দুর্বৃত্ত আর দখলদারদের কবলে পড়ে রাজবাড়িটির গৌরব আর ঐতিহ্য হারিয়ে যাচ্ছে। তবে এখনো যদি এটি সংস্কার করে সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়, তবে ভবিষ্যতে অনেক পর্যটক আকৃষ্ট করবে এই রাজবাড়ি। সরকার পাবে রাজস্ব।
এ বিষয়ে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের আঞ্চলিক পরিচালকের কার্যালয়ের আঞ্চলিক প্রধান নাহিদ সুলতানা বলেন ‘নওগাঁর বলিহার রাজবাড়ি একটি প্রাচীন স্থাপনা। আমাদের পক্ষ থেকে স্থাপনাটির চারপাশ ঘিরে দেয়া হয়েছে। যাতে কেউ এর ক্ষতি করতে না পারে। এলাকার দুর্বৃত্তরা নানাভাবে রাজবাড়িটির ক্ষতি করতে চায়, যার অভিযোগ আমার কাছেও এসেছে। পুরাকীর্তি হিসেবে গেজেটে নাম নেই বলিহার রাজবাড়ির। আমরা চেষ্টা করছি, গেজেটে নাম প্রকাশের। তার পর আমরা এর আরও সংস্কার করতে পারবো।’