বাংলা হেডলাইনস বগুড়া: বগুড়ার গাবতলীতে উৎসবমুখর ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশে ঐতিহ্যবাহী পোড়াদহ মেলা অনুষ্ঠিত হয়েছে। একদিনের এ মেলায় লাখো মানুষের ঢল নামে। বুধবার সকাল থেকেই জমে উঠে মেলা। ১৫৩ বছর ধরে মেলা অনুষ্ঠিত হচ্ছে।
মেলার প্রধান আকর্ষণ ছিল লক্ষাধিক টাকা মূল্যের ৭৩ কেজি ওজনের বাঘাইর মাছ।
বৃহস্পতিবার সকালে শুধু নারীদের কেনাকাটার জন্য বসবে ‘বউমেলা’। এলাকার প্রবীণরা জানান, গাবতলী উপজেলার মহিষাবান ইউনিয়নের গোলাবাড়ি বন্দর এলাকায় গাড়িদহ নদীর তীরে সন্ন্যাসী পূজা উপলক্ষে একদিনের ‘পোড়াদহ’ মেলা বসে। প্রায় ১৫৩ বছর ধরে ব্যক্তি মালিকানাধীন জমিতে স্থানীয়রা এ মেলার আয়োজন করেন। মেলার প্রধান আকর্ষণ বিশাল আকৃতির নদীর মাছ। প্রবীণরা আরও জানান, প্রতি বছর মাঘ মাসের শেষ বা ফাল্গুনের প্রথম বুধবার‘পোড়াদহ’ মেলা অনুষ্ঠিত হয়।
এ সময় জমিতে কোন চাষাবাদ হয়না। মেলাকে ঘিরে উৎসবের আমেজে মেতে উঠেন আশপাশের গ্রামের নানা ধর্ম ও বর্ণের মানুষ। মেলা একদিনের হলেও এর আমেজ ২-৩দিন থাকে।

ঈদ বা অন্য কোন উৎসবে মেয়ে-জামাই বা আত্মীয়-স্বজনদের দাওয়াত না দিলেও পোড়াদহ মেলায় দাওয়াত করা রেওয়াজে পরিণত হয়েছে। মেলাকে সামনে রেখে নারীরা আগেই বাড়িঘর পরিস্কার করে নেন। মুড়ি, খৈ ভাজা, নাড়কেলের নাড়– ও হরেক রকম পিঠা তৈরি করেন। মেলার দিন মেলা থেকে বড় মাছ কিনে স্বজনদের আপ্যায়ন করা হয়। নদী ও সাগরের বড় বড় মাছ, মিস্টি, ফার্নিচার, তৈজষপত্রসহ নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র বিক্রি হয়।
প্রশাসনের কঠোরতায় কোন জুয়া বা অশ্লীল নৃত্য হয়নি। তবে, মেলায় ইচ্ছামতো টোল আদায় ও অব্যবস্থাপনা ছিল বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
এবারের মেলায় ৭৩ কেজি ওজনের যমুনা নদীর বাঘাইর মাছ তোলা হয়েছিল। মাছের মালিক গাবতলী উপজেলার মহিষাবান গ্রামের মাছ ব্যবসায়ী বিপ্লব। মাছের মালিক প্রথমে প্রতি কেজি এক হাজার ৮০০ টাকা দাবি করেন। ওই হিসাবে এ মাছের দাম এক লাখ ৩১ হাজার ৪০০ টাকা। পরে চাহিদা কমে যাওয়ায় প্রতি কেজি এক হাজার ৬০০ হাজার টাকায় ধার্য হয়। এককভাবে এ মাছ কেনা সম্ভব ছিলনা। তাই ক্রেতারা কেজি দরে মাছ কিনতে রাজি হন। মাছ ব্যবসায়ী বিপ্লব জানান, প্রতি বছর তিনি বড় মাছ আমদানির চেষ্টা করে থাকেন। এ মাছটি তিনি যমুনা নদীর মাঝিদের কাছে কেনার দাবি করলেও স্থানীয়রা বলছেন, বিপ্লব মাছটি বগুড়ার চাষী বাজার থেকে সংগ্রহ করেছেন।
মেলায় এ মাছের ক্রেতার চেয়ে দর্শক বেশি ছিলেন। অনেকে মোবাইল ফোনে ছবি সংগ্রহ ছাড়াও সেলফি তুলেছেন। বগুড়া শহরের কারবালা এলাকার ব্যবসায়ী রুহুল আমিন জানান, পরিবারের সদস্যরা বড় মাছ খেতে পছন্দ করেন। তাই তিনি প্রতি বছর পোড়াদহ মেলায় আসেন। কিন্তু এত বড় মাছ এককভাবে কেনা সম্ভব নয়; তাই তিনি ৩ কেজি কাটা মাছ কিনেছেন।
গাবতলী উপজেলার মহিষাবান গ্রামের কৃষক আশরাফ আলী জানান, তিনি ২ কেজি মাছ কিনেছেন। শফিকুল ইসলাম, মিনার, শাহিন, জিহাদ ইসলাম, দেলবরসহ একাধিক মাছ বিক্রেতা জানান, এ মেলায় গাঙচিল, চিতল, বোয়াল, রুই, কাতলা, মৃগেল, হাঙড়ি, গ্রাসকার্প, সিলভার কার্প, বিগহেড, কালবাউশ, পাঙ্গাসসহ বিভিন্ন প্রজাতির মাঝারি ও বড় আকারের মাছ পাওয়া যায়। এসব মাছ ওজনে ৫-২০ কেজি পর্যন্ত রয়েছে। মাছ বিক্রেতারা জানান, প্রতি কেজি গাঙচিতল ৬০০ থেকে ১ হাজার টাকা, চিতল ৮০০ থেকে ১ হাজার ৬০০ টাকা, বোয়াল ৭৫০ থেকে ১৫০০ টাকা, রুই ৫০০ থেকে ১২০০ টাকা, কাতলা ৭০০ থেকে ১ হাজার টাকা, মৃগেল ৩৫০ থেকে ৮০০ টাকা, হাঙড়ি ২৫০ থেকে ৬০০ টাকা, গ্রাসকার্প ৩৫০ থেকে ৫০০ টাকা, সিলভার কার্প ৩৫০ থেকে ৫০০ টাকা, বিগহেড ৪০০ টাকা থেকে ৬০০ টাকা, কালবাউশ ৪০০ থেকে ৬০০ টাকা, পাঙ্গাস ৩৫০ থেকে ৭০০ টাকা।
মেলায় হরেক রকম মিস্টি বিক্রি হয়। প্রতি কেজি মিস্টি ২০০ থেকে ৩০০ টাকায় বিক্রি হয়। ৮ কেজি ওজনের একটি মাছ আকৃতি মিস্টি বিক্রি হয় ৫ হাজার টাকায়। এ ছাড়া মেলায় কাঠ ও স্টিলের আসবাবপত্র, কুল বড়ই, নানা ধরনের আচার, গরু, মহিষ ও খাসির গোশত, পিঁয়াজ, মরিচসহ সব ধরনের নিত্য প্রয়োজনীয় সামগ্রী তোলা হয়েছিল। বিনোদনের জন্য মেলায় ছিল মোটর সাইকেল খেলা, সার্কাস, জাদু খেলা ও নাগরদোলা।
মেলার পরিচালক মহিষাবান ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আমিনুল ইসলাম জানান, শান্তিপূর্ণ পরিবেশে পোড়াদহ মেলা অনুষ্ঠিত হয়েছে। বৃহস্পতিবার সকালে শুধু নারীদের কেনাকাটার জন্য ‘বউমেলা’ অনুষ্ঠিত হবে। গাবতলী থানার ওসি সাবের রেজা আহমেদ জানান, শান্তিপূর্ণ ও সুশৃংখল পরিবেশে ঐতিহ্যবাহী পোড়াদহ মেলা অনুষ্ঠিত হয়েছে। কোথাও কোন অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি।
বগুড়া পুলিশ সুপার আলী আশরাফ ভূঞা জানান, ঐতিহ্য সমৃদ্ধ এই পোড়দহ মেলা। মেলায় সকল প্রকার নিরাপত্তায় কাজ করছে পুলিশ সদস্যরা।